
এম শাহীন আলম: কুমিল্লা সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের হয়রানি, নামজারি ও খারিজে অযথা সময়ক্ষেপণ এবং “অফিস খরচের” নামে অতিরিক্ত অর্থ দাবি সহ সেবা গ্রহিতাদের হয়রানির বিস্তৃর অভিযোগ। একই সঙ্গে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, খতিয়ান ও রেকর্ড সংশোধন, সরকারি খাসজমি ব্যবস্থাপনা, নথি সংরক্ষণ এবং ভূমি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরিতেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) আবুল কাশেমের যোগসাজশে তার যোগদানের পর থেকে অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষের হয়রানি এবং “অফিস খরচের” নামে অতিরিক্ত অর্থ দাবির প্রবণতা বেড়েছে।
জানা গেছে, জগন্নাথপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সবচেয়ে বেশি সেবা নিতে আসেন নামজারি, খারিজ, খতিয়ান সংশোধন ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের জন্য। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও কোনো কোনো আবেদন অযথা সময় ধরে আটকে রাখা হয়। ফাইলের অগ্রগতি জানতে গেলে সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্ন অজুহাতে অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার কথা বলে “অফিস খরচ”সহ বিভিন্ন খরচের নামে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের আরও অভিযোগ, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের ক্ষেত্রেও সরকারি নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার পর রসিদ প্রদানে গড়িমসির অভিযোগও রয়েছে। খতিয়ান ও ভূমির রেকর্ড সংশোধনের ক্ষেত্রেও নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো আবেদন যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একইভাবে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ বা আবেদনের ক্ষেত্রে সরেজমিন তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ছাড়াই প্রতিবেদন তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও সরকারি খাসজমি ও জলাশয় ব্যবস্থাপনা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি জমি দখল, বন্দোবস্ত কিংবা অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তারা কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে জগন্নাথপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে দালালচক্রের প্রভাবের অভিযোগও উঠেছে। সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সরাসরি অফিসে গিয়ে সাধারণ প্রক্রিয়ায় সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু মধ্যস্থতাকারী বা দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে অনেক ক্ষেত্রে কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নায়েবের সঙ্গে যোগসাজশে কোনো কোনো মধ্যস্থতাকারী সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে ভূমিকা রাখছেন। এমনকি সরকারি কর্মচারী না হয়েও ব্যক্তিগত লোকজনের মাধ্যমে কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে নায়েব আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে।
অফিসের নথি ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন সেবাগ্রহীতার দাবি, কোনো কোনো ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা, নথি খুঁজে পেতে বিলম্ব এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে গড়িমসি করা হয়। কোনো সেবাগ্রহীতা লিখিত অভিযোগ করলে সেটি কীভাবে গ্রহণ, তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এছাড়া নায়েবের পরিচিত ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাজ তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হলেও সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন কারণে অপেক্ষা করতে হয় এমন অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে গত কয়েক মাসের নামজারি আবেদন, খারিজ মামলা, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের রেকর্ড, খতিয়ান সংশোধনের নথি, খাসজমির তথ্য, অভিযোগ রেজিস্টার, ফাইল চলাচল রেজিস্টার এবং সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
অভিযোগের বিষয়ে নায়েব আবুল কাশেমের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন আমার জানা সত্বে আমার অফিসে কোন ধরনের অনিয়ম হয় না।
জগন্নাথপুর ইউনিয়ন ভুমি অফিসের অনিয়ম এবং অফিস খরচের নামে ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে জানাতে কুমিল্লা সদর এসিল্যান্ড মাশিয়াত আকতার এর মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি তার বক্তব্যে বলেন, আমি নায়েব আবুল কাশেমের সাথে আপনার অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো তিনি যদি এরপরও না শুধরায় তাহলে আমি তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তা বা একটি ভূমি অফিসের অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরকারি ভূমিসেবা পাওয়ার অধিকার এবং সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বিষয়ও জড়িত।
তাই জগন্নাথপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে “অফিস খরচের” নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ, নামজারি ও খারিজে সময়ক্ষেপণ, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, খতিয়ান সংশোধন, খাসজমি ব্যবস্থাপনা, নথি সংরক্ষণ এবং দালালচক্রের প্রভাব এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।



