সিলেটহবিগঞ্জ

হবিগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের ডিডি নূরুল হুদার যোগসাজশে দালালদের শরণাপন্ন হতে গ্রাহকদের আবেদনে হয়রানির অভিযোগ

“সরাসরি আবেদন জমা দিতে নানা আপত্তি, দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলে কাজ সহজ—ভুক্তভোগীদের অভিযোগ; অনিয়মের কথা অস্বীকার ডিডির”

এম শাহীন আলম :

পাসপোর্ট নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাগুলোর একটি। অনলাইনে আবেদন করার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা। জাতীয় তথ্য বাতায়নেও পাসপোর্ট সেবাকে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সেবা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু হবিগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সরাসরি সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন আবেদনকারী। তাদের অভিযোগ, আবেদনপত্র গ্রহণ, কাগজপত্র যাচাই এবং বিভিন্ন ত্রুটি দেখানোর ক্ষেত্রে এমন জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ আবেদনকারীদের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত অফিসের আশপাশে থাকা কথিত দালালদের সহযোগিতা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

আর এসব অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান উপপরিচালক (ডিডি) নূরুল হুদার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তাদের দাবি, অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে আবেদনকারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হলেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

তবে ডিডি নূরুল হুদা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, তার জানা মতে অফিসে কোনো ধরনের অনিয়ম নেই।

** তিন দিনেও আবেদন জমা হয়নি

মাধবপুর উপজেলা থেকে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে হবিগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আসা রিপন নামের এক যুবক জানান, পরপর তিন দিন অফিসে এসেও তিনি নিজের আবেদন জমা দিতে পারেননি।

রিপনের অভিযোগ, কাউন্টারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন জমা দিতে গেলে তার কাগজপত্রে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে বলে জানানো হয়। কী সমস্যা এবং কীভাবে তা সমাধান করতে হবে এ বিষয়ে তিনি জানতে চাইলেও সন্তোষজনক সমাধান পাননি বলে দাবি তার।

তার ভাষায়, বারবার অফিসে এসে ঘোরাঘুরি করার পর একপর্যায়ে তিনি দালালের মাধ্যমে আবেদন জমা দিতে বাধ্য হন।

রিপনের দাবি, দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে তাকে সরকারি নির্ধারিত খরচের বাইরে ১ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে।

** সরাসরি আবেদন জমা দিতে  গেলে সমস্যা, দালালের মাধ্যমে গেলে সহজ সমাধান

শুধু রিপন নন, পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা আরও কয়েকজন আবেদনকারী একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন আবেদনকারী বলেন, সরাসরি কাউন্টারে গিয়ে আবেদন জমা দিতে গেলে কখনো কাগজে ত্রুটি, কখনো তথ্যের অসঙ্গতি, আবার কখনো অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে আবেদন ফেরত দেওয়া হয়।

তাদের অভিযোগ, এসব সমস্যার সমাধান জানতে গিয়ে একপর্যায়ে অফিসের বাইরে থাকা কথিত দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।

আবেদনকারীদের কয়েকজনের ভাষ্য, সাধারণ মানুষ অনলাইনে আবেদন করার পর কোন কাগজ কোথায় দিতে হবে কিংবা কোনো ভুল থাকলে কীভাবে তা সংশোধন করতে হবে সবসময় তা বুঝতে পারেন না। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের সহযোগিতার প্রস্তাব দেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, দালালরা আবেদনকারীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে কাজটি সহজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

** আবেদন গ্রহণেই যদি জটিলতা, তাহলে দালালের প্রয়োজন কেন?

অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো একজন আবেদনকারী যদি নিজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সরকারি অফিসে গিয়ে নিয়ম মেনে আবেদন করতে চান, তাহলে তাকে কেন বারবার ঘুরতে হবে?

আর যদি কোনো কাগজে সত্যিই ত্রুটি থাকে, তাহলে সেই ত্রুটি স্পষ্টভাবে লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে কি না সেটিও যাচাইয়ের বিষয়।

অভিযোগকারীরা বলছেন, আবেদন গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হলে দালালের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।

তাদের প্রশ্ন, একজন সাধারণ আবেদনকারীকে যে সমস্যার কথা বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, একই ধরনের আবেদন দালালের মাধ্যমে কীভাবে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে যাচ্ছে?

** বিশেষ চিহ্ন নিয়ে নতুন অভিযোগ

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা আক্কাস আলী নামে এক আবেদনকারী আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন।

তার দাবি, কিছু আবেদনপত্রে বিশেষ ধরনের সাংকেতিক বা গোপন চিহ্ন থাকলে সেগুলো দ্রুত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সাধারণ আবেদনকারীদের আবেদনপত্রে ওই ধরনের চিহ্ন না থাকলে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়।

আক্কাস আলীর দাবি, এই প্রক্রিয়া সত্যি হলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কারণ একজন সাধারণ আবেদনকারী কোন প্রক্রিয়ায় আবেদন জমা দেবেন এবং কোন আবেদন অগ্রাধিকার পাবেন তা নির্ধারিত সরকারি নিয়মে হওয়ার কথা।

** টোকেন ব্যবস্থাপনাতেও প্রশ্ন

আবেদনকারীদের অভিযোগের আরেকটি অংশ হলো টোকেন ব্যবস্থা।

তাদের দাবি, কখন আবেদন নেওয়া হবে, কোন ক্রমে নেওয়া হবে এবং কোনো আবেদন গ্রহণ না করলে তার কারণ কী—এসব বিষয়ে অনেক সময় পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায় না।

ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও কেউ কেউ আবেদন জমা দিতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ।

যদি সত্যিই এমন পরিস্থিতি থাকে, তাহলে টোকেন বিতরণ ও আবেদন গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল বা দৃশ্যমান পদ্ধতিতে আরও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগের বিষয়ে হবিগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক নূরুল হুদার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হয়।

তিনি বলেন, “আপনি যে অভিযোগগুলোর কথা বলেছেন, তা ভিত্তিহীন। আমার এই অফিসে আমার জানা মতে কোনো ধরনের অনিয়ম নেই।”

পাসপোর্ট করতে আসা অধিকাংশ মানুষই মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে চান না। তারা চান নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে নিজের আবেদন নিজেই জমা দিতে।

তাই হবিগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা, টোকেন ব্যবস্থাপনা প্রকাশ্য করা, আবেদন ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো এবং অফিসের আশপাশে কথিত দালালদের তৎপরতা থাকলে তা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

তাদের প্রত্যাশা, সরাসরি আবেদন করলে হয়রানি আর দালালের মাধ্যমে গেলে সহজ—এমন কোনো ধারণা যেন সরকারি পাসপোর্ট সেবায় তৈরি না হয়।

সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—সাধারণ আবেদনকারীর জন্য সরকারি সেবা কি সত্যিই সহজ ও স্বচ্ছ, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দালাল ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিভিত্তিক তদন্ত ও কার্যকর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button