পতেঙ্গায় দুই বিএনপি নেতা ও টিআই সেলিমের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ চালকরা জানলেন ওসি পারভেজ আলী

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। কর্ণফুলী নদীর মোহনা ঘেঁষা এ এলাকায় প্রতিদিন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটকের সমাগম ঘটে। তবে জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্রের গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে ইজারার নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, চালকদের হয়রানি, প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পতেঙ্গা সৈকতের পার্কিং এলাকায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে নির্ধারিত ইজারা ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিএনজি অটোরিকশা থেকে ২০ টাকা, প্রাইভেটকার থেকে ৫০ টাকা, মাইক্রোবাস থেকে ৬০ টাকা এবং বাস থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। চালকদের কয়েকজনের অভিযোগ, টাকা দিতে আপত্তি করলে দুর্ব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পতেঙ্গা এলাকার সালাউদ্দিন এবং তার সহযোগী হিসেবে পরিচিত ফোরকান। সালাউদ্দিন নিজেকে পতেঙ্গা সৈকতের পার্কিং এলাকার ইজারাদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদককে জানান, তিনি নাহার এন্টারপ্রাইজের নামে জায়গাটি ইজারা নিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইজারার খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে তাকে নানা জায়গায় অর্থ ব্যয় করতে হয়। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথোপকথনে প্রশাসন, নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করার প্রসঙ্গও এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফোরকানের কথোপকথনেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও মহলকে ‘ম্যানেজ’ করার প্রসঙ্গ উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ না করার বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব এবং পরবর্তীতে বিকাশ নম্বর চেয়ে মাসিক অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবের অভিযোগও রয়েছে। এসব বক্তব্যের সমর্থনে প্রতিবেদকের কাছে গোপন ভিডিও ও কল রেকর্ড থাকার দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় এক ভাসমান দোকানদারের অভিযোগ, সালাউদ্দিন, ফোরকান, আলমগীর ও শফিকসহ কয়েকজনের মাধ্যমে দোকানদারদের কাছ থেকেও প্রতিদিন অর্থ আদায় করা হয়। তার দাবি, দৈনিক আদায়ের পরিমাণ ১৫ হাজার টাকার বেশি হতে পারে। তবে এসব অর্থ আদায়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের কার্যাদেশের একটি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পতেঙ্গা বীচের মেইন পয়েন্ট থেকে পূর্ব পাশের গাড়ি পার্কিং এলাকা নাহার এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো. সালাউদ্দিনের অনুকূলে ইজারা দেওয়ার তথ্য রয়েছে। নথিতে ইজারা মূল্য ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। ভ্যাট, আয়কর ও জামানাসহ সরকারি খাতে বিভিন্ন অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়ও এতে উল্লেখ রয়েছে। ১৪৩৩ বাংলা সনের ১ বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কার্যাদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পতেঙ্গা সার্কেল ভূমি অফিস ও পতেঙ্গা থানাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করার কথাও রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন ইজারা বৈধভাবে দেওয়া হয়ে থাকলেও নির্ধারিত স্থান শর্তের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ একেবারেই সত্য ইজারার বাইরে যারা চাঁদাবাজি করছেন তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এবং সচেতন মহল।
পতেঙ্গা ট্যুরিস্ট পুলিশের ওসি ইমাম হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, পার্কিংয়ের ওই স্থানটি ট্যুরিস্ট পুলিশের আওতাধীন নয়। এলাকাটি জেলা প্রশাসন, পতেঙ্গা থানা পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ একাধিক সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেও জানান তিনি। তিনি নিজে কোনো চাঁদার টাকা নেননি বলে দাবি করেন।
টিআই সেলিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাছাড়া টিআই সেলিম অত্র এলাকায় বিভিন্ন যান পরিবহন থেকে লক্ষ লক্ষ চাঁদাবাজি করছেন বলে বহুদিনের অভিযোগ রয়েছে পতেঙ্গা থানার ওসি পারভেজ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি জানার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পতেঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় ইজারার সীমানা, নির্ধারিত ফি এবং আদায়ের নিয়ম প্রকাশ্যে প্রদর্শন, প্রতিটি যানবাহনকে বৈধ রসিদ প্রদান এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তি কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে তারও প্রামাণ্য ভিত্তিতে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে ইজারা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ থেকেও সাধারণ পর্যটক ও পরিবহনশ্রমিকরা সুরাহা পাবেন।



