অপরাধএক্সক্লুসিভদুর্নীতি

বদলি বাণিজ্যের কারণেই বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতি ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ

এম শাহীন আলম: চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যেমন প্রতিযোগিতা রয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন বা বদলি নিয়ে তেমনই প্রতিযোগিতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হতে কোথাও কোথাও কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। আর এই কথিত ‘বদলি বাণিজ্য’কে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অনিয়ম, ঘুষ লেনদেন, দালালনির্ভরতা ও গ্রাহক হয়রানি বাড়ছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, যেসব অফিসে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বেশি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, সেসব গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন পেতে কর্মকর্তাদের আগ্রহও বেশি।

অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের কর্মস্থলে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে পদায়ন পাওয়ার পর সেই অর্থ তুলে নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ওপর। তখন নিয়মিত সরকারি সেবার পাশাপাশি দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দ্রুত ফাইল ছাড়ানো, কাগজপত্র যাচাই ও বিভিন্ন ধাপে ‘ম্যানেজ’ করার মতো অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ: বিভিন্ন বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কয়েকটি সূত্রের দাবি, মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে পরিচালক পদে পদায়নের জন্য ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা, উপপরিচালক পদে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা এবং সহকারী পরিচালক পদে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের কথা শোনা যায়।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নের আদেশ, সরকারি নথি, সম্পদ বিবরণী, আয়-ব্যয়ের তথ্য এবং পদায়নের সময়কাল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যেসব পাসপোর্ট অফিস নিয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে: বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, বদলি-পদায়ন, অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানি ও দালালনির্ভরতা নিয়ে আলোচনায় থাকা অফিসগুলোর মধ্যে রয়েছে—উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, কেরানীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, নারায়ণগঞ্জ জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, কুমিল্লা জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, কক্সবাজার জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, বরিশাল বিভাগীয় ও জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, বগুড়া জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, নরসিংদী জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, নোয়াখালী জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, গাজীপুর জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, ময়মনসিংহ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস, খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস, যশোর জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, ফেনী জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, হবিগঞ্জ জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস অন্যতম।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি অফিসের কার্যক্রম পৃথকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপরে উল্লেখিত প্রতিটি পাসপোর্ট অফিসেই দালালনির্ভরতার অভিযোগ: পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা ও ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আবেদন গ্রহণ, কাগজপত্র যাচাই, ছবি ও বায়োমেট্রিক, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং পাসপোর্ট বিতরণ বিভিন্ন ধাপে সেবা নিতে গিয়ে দালালের শরণাপন্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকটি সূত্রের দাবি, উপরে উল্লেখিত বেশিরভাগ অফিস গুলোতে সেবাগ্রহীতাদের এমনভাবে হয়রানি করা হয় যে, তাদেরকে শেষ পর্যন্ত দালালের মাধ্যমে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। আবার কোথাও কোথাও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে দালালদের যোগাযোগ থাকার অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়েও প্রশ্ন: পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, সম্প্রতি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বিভাগীয় অফিসে পদায়ন পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রোজী খন্দকার উপপরিচালক – উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, ঢাকা; নূরুল হুদা, সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস এবং মধুসূদন সরকার, উপপরিচালক, বরিশাল বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পদায়ন ও পরবর্তী কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে তারা দাবি করেন।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের আদেশের বাইরে গিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক বদলি আদেশের মাধ্যমে ময়মনসিংহের উপপরিচালক শামীম আহমদ, কুমিল্লার উপপরিচালক সালাহ্ উদ্দিন এবং নোয়াখালীর উপপরিচালক আফজাল হোসেনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে উপপরিচালক জামাল হোসেনকে কুমিল্লা জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে, উপপরিচালক মেহেদী হাসানকে নোয়াখালী জেলা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে এবং উপপরিচালক আরেক মেহেদী হাসানকে ময়মনসিংহ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে পদায়ন করা হয়।

তবে এসব বদলি সরকারি বিধি ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের অংশ কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে তা নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট আদেশ, নথির মাধ্যমে অনুসন্ধান পূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

বদলি ও সেবার মানের সম্পর্ক: অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে কোনো কর্মকর্তা যদি অনৈতিক অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন পাওয়ার সুযোগ পান বলে অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে সেই অর্থের চাপ কি পরবর্তীতে সেবাগ্রহীতাদের ওপর পড়ে?

সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি হলে সরকারি সেবা ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। সেখানে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া, দ্রুত কাজ করে দেওয়া, ফাইল অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ তৈরি হতে পারে।

এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ নাগরিক। যারা নিয়ম মেনে নিজেরাই পাসপোর্টের আবেদন করতে চান, তাদের অতিরিক্ত সময়, ভোগান্তি ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে এমন অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ যাচাইয়ে যেসব নথি গুরুত্বপূর্ণ: বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সত্য কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রথমত, গত কয়েক বছরে বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসগুলোর বদলি ও পদায়নের আদেশ পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, একই কর্মকর্তাকে বারবার গুরুত্বপূর্ণ বা অধিক সেবাগ্রহীতার চাপ রয়েছে এমন অফিসে পদায়ন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, পদায়নের আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী, আয়-ব্যয় ও সম্পদের অস্বাভাবিক পরিবর্তন আছে কি না, তা আইন অনুযায়ী যাচাই করা যেতে পারে।

চতুর্থত, সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে সেবাগ্রহীতাদের লিখিত অভিযোগ, অভিযোগ বাক্স, হটলাইন এবং অনলাইন অভিযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, দালালদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা, মামলা এবং গ্রেপ্তারের তথ্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

এ ছাড়া অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ, দর্শনার্থী রেজিস্টার, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথির গতিবিধিও তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে। বদলি বাণিজ্য, ঘুষ লেনদেন, দালালদের পৃষ্ঠপোষকতা ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুসন্ধান পূর্বক যথাযথ প্রশাসনিক গ্রহণ করা জরুরি।

প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত: পাসপোর্ট একজন নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথি। এ সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নাগরিককে দালালের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করা কিংবা অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা সরকারি সেবা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তাই দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের যে অভিযোগ উঠেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

একই সঙ্গে দালালনির্ভরতা, গ্রাহক হয়রানি, ঘুষ লেনদেন এবং সেবার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগগুলো পৃথকভাবে যাচাই করা দরকার। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাধারণ নাগরিকের জন্য স্বচ্ছ ও সহজ সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

উপরে উল্লেখিত প্রতিটি বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস সমূহে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। আরো নতুন নতুন তথ্য নিয়ে আগামী সংখ্যায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button