অনুসন্ধানঅপরাধ

নারায়ণগঞ্জ আদালতের সেরেস্তাদার সফিকুলের নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়, আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন?

এম শাহীন আলম: নারায়ণগঞ্জ আদালতের সেরেস্তাদার সফিকুল ইসলামের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা কথিত বিপুল সম্পদ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি চাকরিতে সীমিত বেতন-ভাতার বিপরীতে নিজ জেলা গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় দুটি ভবন নির্মাণ, নিজ এলাকা ও শ্বশুরবাড়ি এলাকায় নিজের এবং স্ত্রীর নামে জমি ক্রয় ও বন্দকের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পাশাপাশি বগুড়া শহরের কলোনিপাড়া এলাকায় জমিসহ একটি বহুতল ভবন ক্রয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে।

তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, নির্মাণ ব্যয় এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, ভূমি রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণী যাচাই না করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—সফিকুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের সঙ্গে তাঁর বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সামঞ্জস্য কতটুকু

পেশকার থাকতেই সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পেশকার হিসেবে কর্মরত থাকার সময় থেকেই সফিকুল ইসলামের সম্পদ বৃদ্ধির প্রবণতা শুরু হয়। সেরেস্তাদার পদে পদোন্নতি পাওয়ার আগেই তাঁর নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন স্থাবর সম্পদ গড়ে ওঠার দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার নিজ গ্রামে দুটি ভবন নির্মাণ এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি কেনার বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।

তবে এসব সম্পদ তাঁর বেতন, বৈধ সঞ্চয়, পারিবারিক সম্পত্তি, উত্তরাধিকার কিংবা অন্য কোনো বৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত কি না—তা নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

গাইবান্ধার সাঘাটায় দুটি ভবন, নির্মাণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন –

সফিকুল ইসলামের নিজ জেলা গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার গ্রামের বাড়িতে দুটি ভবন রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ভবন দুটির নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়েছে।

তবে ভবন দুটি কখন নির্মাণ করা হয়েছে, নির্মাণের সময় সফিকুল ইসলামের পদ ও বেতন কত ছিল, জমির মালিকানা কার নামে, ভবন নির্মাণে প্রকৃত ব্যয় কত এবং অর্থের উৎস কী—এসব তথ্য এখনো নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

ভবন নির্মাণের অনুমোদন, জমির দলিল, নামজারি, খাজনা, নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের আয়কর নথি পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

তার নিজ এলাকা ও শ্বশুরবাড়িতে জমি ক্রয়ের অভিযোগ –

সফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রীর নামে তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটায় নিজ এলাকা এবং শ্বশুরবাড়ি এলাকায় একাধিক জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব জমির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। কোনো কোনো সম্পদ তাঁর নিজের নামে এবং কিছু সম্পদ স্ত্রীর নামে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকে এখন পর্যন্ত সফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রীর নামে কতটি জমি কেনা হয়েছে, জমিগুলোর অবস্থান কোথায়, দলিলে মূল্য কত দেখানো হয়েছে, প্রকৃত লেনদেন কত এবং এসব অর্থের উৎস কী?

এ ছাড়া কোনো জমি বন্ধক রাখা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণসংক্রান্ত নথিও যাচাই করা প্রয়োজন।

বগুড়ার কলোনিপাড়ায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ?

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বগুড়া শহরের কলোনিপাড়া এলাকায় জমিসহ একটি বহুতল ভবন।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সম্পদ ক্রয় বা অধিগ্রহণে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে প্রকৃত অর্থে সম্পদটির মূল্য কত, দলিলে কত টাকা দেখানো হয়েছে, জমির আয়তন কত, ভবন নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং সম্পদটি কার নামে—এসব তথ্য দলিল, নামজারি, কর নথি ও অন্যান্য সরকারি রেকর্ডের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দলিলে ঘোষিত মূল্য ও স্থানীয় বাজারমূল্যের পার্থক্যও অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে।

সম্পদ বিবরণীতে কী তথ্য রয়েছে?

সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নিজ নামে ও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ, আয় এবং দায়-দেনার তথ্য সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ঘোষণার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

সফিকুল ইসলাম চাকরির বিভিন্ন সময়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল করে থাকলে সেখানে তাঁর নিজ নামে ও স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য কীভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষ করে অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে—

গাইবান্ধার সাঘাটায় দুটি ভবন;

নিজ এলাকায় ক্রয় করা জমি;

শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ক্রয় করা জমি;

তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা জমি;

বগুড়া শহরের কলোনিপাড়ার জমি ও বহুতল ভবন;
. নারায়ণগঞ্জ চাষাপাড়ার কালীর বাজারে বহুতল ভবনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নিজ নামে ফ্ল্যাট এবং নারায়ণগঞ্জ কয়েকটি জায়গায় প্লট ও জমি ক্রয়ের অভিযোগ।
এসব সম্পদের ক্রয়মূল্য ও নির্মাণ ব্যয়;

সংশ্লিষ্ট সম্পদের অর্থের উৎস;

আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণীতে সম্পদগুলোর উল্লেখ।

এসব সম্পদের কোনোটি সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ না থাকলে তার কারণও সংশ্লিষ্ট নথি ও বিধিবিধান অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন।

ব্যাংক লেনদেন ও আয়কর নথিতে মিলবে প্রকৃত চিত্র

সফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য শুধু জমির দলিল বা ভবনের মালিকানা দেখলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট সময়ের ব্যাংক লেনদেন, আয়কর রিটার্ন, ঋণ গ্রহণের তথ্য, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি, পারিবারিক সম্পদের উৎস এবং সরকারি সম্পদ বিবরণীও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

কারণ কোনো সম্পদের বৈধ উৎস থাকলে তার পক্ষে দলিল, ব্যাংক লেনদেন, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কাগজপত্র, ঋণের নথি বা আয়কর নথির মাধ্যমে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের সঙ্গে ঘোষিত আয় ও সম্পদ বিবরণীর বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও যাচাইয়ের দাবি রাখে।

অনুসন্ধানে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

সফিকুল ইসলামের সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—

১. তিনি কোন সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন এবং চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁর পদ ও বেতন কত ছিল?

২. পেশকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর নামে কী কী স্থাবর সম্পদ ছিল?

৩. সেরেস্তাদার পদে পদোন্নতির আগে ও পরে তাঁর সম্পদের পরিমাণ কত?

৪. গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় তাঁর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে কতটুকু জমি রয়েছে?

৫. সেখানে নির্মিত দুটি ভবনের নির্মাণকাল ও প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় কত?

৬. ভবন নির্মাণের অর্থের উৎস কী এবং সংশ্লিষ্ট নির্মাণের অনুমোদন রয়েছে কি না?

৭. নিজ এলাকা ও শ্বশুরবাড়ি এলাকায় তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর নামে কতটি জমি রয়েছে?

৮. এসব জমি কখন এবং কী মূল্যে কেনা হয়েছে?

৯. বগুড়া শহরের কলোনিপাড়ার জমি ও বহুতল ভবন কার নামে?

১০. ওই সম্পদ ক্রয় বা নির্মাণে প্রকৃত অর্থে কত টাকা ব্যয় হয়েছে?

১১. এসব সম্পদ সংশ্লিষ্ট সময়ে দাখিল করা আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে কি না?

১২. তাঁর বৈধ আয়, সঞ্চয়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ ও অন্যান্য বৈধ উৎসের সঙ্গে বর্তমান সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না?

অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন সফিকুল ইসলাম-

সফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগের কথা বলছেন, তার কোনো বক্তব্য আমার কাছে নেই।”

তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে নথিপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড পর্যালোচনা করা জরুরি।

নারায়ণগঞ্জ আদালতের সেরেস্তাদার সফিকুল ইসলামের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা কথিত সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য, নির্মাণ ব্যয়, অর্থের উৎস এবং আয়কর ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে তার সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

দলিলপত্র, ভূমি রেকর্ড, নামজারি, কর নথি, ভবন নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই করে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। অনুসন্ধানে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button