ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ-ডি নিশ্চিত করতে কম দামের ছোট প্যাকেজের প্রস্তাব
অপরাধ বিচিত্রা ডেস্ক: ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬:নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ডি’ সমৃদ্ধ নিরাপদ ও মানসম্মত ভোজ্যতেল সহজলভ্য করতে কম দামের ছোট আকারের প্যাকেজ বা মিনি-প্যাক বাজারে চালুর প্রস্তাব উঠেছে। একই সঙ্গে ভোজ্যতেলের ব্যয়-সাশ্রয়ী ও কার্যকর প্যাকেজিং ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা।
মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব প্রস্তাব উঠে আসে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মোঃ জহিরুল ইসলাম।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল বিক্রির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে এবং এভাবে বিক্রি করা তেলে প্রয়োজনীয় ফর্টিফিকেশন নিশ্চিত করাও কঠিন। ফলে ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল নিশ্চিত করতে কার্যকর প্যাকেজিং ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কনসালটেন্ট মুশতাক হাসান মুহঃ ইফতিখার কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি সমৃদ্ধকৃত ভোজ্যতেলের জন্য ব্যয়-সাশ্রয়ী প্যাকেজিং ব্যবস্থা চালুর একটি কৌশলপত্র তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন আকার ও মূল্যের প্যাকেজ বাজারে রাখা যেতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কম দামে ছোট আকারের মিনি-প্যাক চালু করা হলে তাঁদের কাছে ভিটামিনসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল পৌঁছানো সহজ হবে।
কর্মশালায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ শোয়েব বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্যাকেজিং ব্যবস্থা সাশ্রয়ী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে পরিবেশগত স্থায়িত্বের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁর মতে, পাউচ ও পিইটি প্যাকেজিং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বিকল্প হতে পারে।
বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক এস এম আবু সাঈদ বলেন, ভোক্তার চাহিদা, ক্রয়ক্ষমতা ও পণ্যের মান বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী প্যাকেজিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভোজ্যতেলের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান বাস্তবায়নে বিএসটিআই কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) মোঃ মাসুম আরেফিন বলেন, ভোজ্যতেলের প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করা দরকার। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় ২০০ মিলিলিটার পর্যন্ত ছোট প্যাকেজ বাজারে রাখা যায় কি না, তা বিবেচনার পরামর্শ দেন তিনি।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া ভোজ্যতেলের মান, নিরাপত্তা ও ফর্টিফিকেশন বিষয়ে ভোক্তাদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুধু শহরকেন্দ্রিক না রেখে গ্রাম পর্যায়েও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুলতান আলমও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা, মান ও ফর্টিফিকেশন বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। প্রস্তাবিত প্যাকেজিং ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে আরও আলোচনা ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) সেবাস্টিন রেমা বলেন, ভোক্তাদের চাহিদা ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ও ভোক্তাবান্ধব পণ্য বাজারে আনা প্রয়োজন। ভোজ্যতেলের প্যাকেজিংয়ে তাপমাত্রা ও আলোর প্রভাবসহ পণ্যের গুণগত মান সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন তিনি। এ ক্ষেত্রে মাল্টিলেয়ার পাউচকে একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন।
কর্মশালায় অধিদপ্তরের পরিচালক (কার্যক্রম ও গবেষণাগার) আতিয়া সুলতানা বলেন, ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ ও ডি ফর্টিফিকেশন নিশ্চিত করে ভোক্তাদের নিরাপদ, মানসম্মত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩-এর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ সমৃদ্ধকরণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। পুষ্টি ঘাটতি নিরসন ও জনগণের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বিদ্যমান নীতির প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
কর্মশালায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, ক্যাব, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ভোজ্যতেল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, প্যাকেজিং শিল্প, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, সামাজিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।



