ইসলাম ধর্মধর্ম ও জীবন

নামাজ শেষে হাত তুলে মুনাজাত কি বিদআত?

ধর্ম ও জীবন ডেস্ক: ফরজ নামাজ সালাম ফেরানোর পর হাত তুলে মুনাজাত করা বিদআত কি না—এ নিয়ে সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে প্রায়ই নানা দ্বিধা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একদল এটিকে বিদআত বলে আখ্যা দেন, আবার অনেকে এটিকে নামাজের অপরিহার্য অংশ মনে করেন। তবে ইসলামি ফিকহ ও হাদিসের সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণে উভয় ধারণার মাঝেই ভারসাম্যের বার্তা পাওয়া যায়।

মূলত দুআ নিজেই একটি স্বতন্ত্র ও মহান ইবাদত। পবিত্র কুরআনের সুরা গাফিরের ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” এছাড়া দুআর সময় দুই হাত তোলার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হযরত সালমান আল-ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ অত্যন্ত লজ্জাশীল ও দানশীল; বান্দা যখন তাঁর দিকে দুই হাত তোলে, তখন তিনি সেই হাত দুটো খালি ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।” (সুনান আবু দাউদ: ১৪৮৮)।

তবে ফরজ নামাজের ক্ষেত্রে মৌলিক বিভ্রান্তি তৈরি হয় দুআর স্থান ও নিয়ম নিয়ে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল বিষয়গুলো নিম্নরূপ:

১. নিয়মিত নিয়ম বানিয়ে নেওয়ার ফিকহি বিধান

রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের পর বাধ্যতামূলক বা স্থায়ী নিয়ম হিসেবে নিয়মিত দুই হাত তুলে মুনাজাতের প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে “প্রতিটি ফরজ সালাতের পরপরই হাত তুলে মুনাজাত করা সুন্নাহর অপরিহার্য অংশ”—এমন দাবি করা বা এটিকে নামাজের অনুষঙ্গ বানানো সঠিক নয়। তবে কেউ যদি কোনো বিশেষ প্রয়োজনে একা একা সাধারণভাবে হাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, তাকে ঢালাওভাবে ‘বিদআতি’ বলাও সমীচীন নয়।

২. সালাতের মধ্যবর্তী ও পরবর্তী দুআর স্থান

হাদিসে কোন সময়ে দুআ বেশি কবুল হয় জানতে চাওয়া হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতের শেষ ভাগ এবং ‘ফরজ সালাতগুলোর দুবুরে’ (শেষ অংশে বা পরে) দুআ কবুলের কথা উল্লেখ করেছেন (জামে আত-তিরমিজি: ৩৪৯৯)। ইসলামি পণ্ডিতদের একাংশের মতে, সালাতের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ ও দরুদ পাঠের পর সালাম ফেরানোর আগের সময়টি দুআ কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। সহিহ বুখারির ৮৩৫ নম্বর হাদিসেও তাশাহহুদের পর পছন্দসই দুআ বেছে নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

৩. সালাম ফেরানোর পর প্রমাণিত সুন্নাহ

সালাম ফেরানোর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে নির্দিষ্ট কিছু মাসনূন যিকির ও দুআ সহিহ সূত্রে প্রমাণিত। সালাম ফিরিয়েই তিনি তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ এবং “আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম” পাঠ করতেন (সহিহ মুসলিম: ৫৯১)। এছাড়া আয়াতুল কুরসি এবং সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার পাঠের বিধান হাদীসে স্পষ্টভাবে বিধৃত।

৪. সমবেত মুনাজাত ও মূল ভারসাম্য

ফরজ নামাজের পর ইমাম-মুক্তাদি মিলে জামাতবদ্ধভাবে সমবেত মুনাজাতের বিষয়টি নিয়ে ফিকহবিদদের মাঝে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা রয়েছে। তবে মূল নীতি হলো—নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে যেকোনো ব্যক্তিগত আকুতি বা দুআ করাকে নিষিদ্ধ বা ‘বিদআত’ বলা যেমন অনুচিত, তেমনি নিজের অভ্যাস বা পছন্দকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট সুন্নাহর সমকক্ষ করাও অনুচিত।

ফিকহবিদরা পরামর্শ দেন, সালামের আগের মূল্যবান মুহূর্তে এবং নামাজ শেষের মাসনূন যিকিরগুলোতে মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি একান্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যেকোনো সময় মন খুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাই একজন মুমিনের কাম্য।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button