বাইতুল্লাহর জুমার খুতবায় শাইখ সুদাইসের ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা
ইসলামিক ডেস্ক:বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানবজীবনে সোশ্যাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অবাধ বিস্তার এবং এর অপব্যবহারের ভয়াবহ দিকগুলো তুলে ধরে সম্প্রতি বাইতুল্লাহর মিম্বর থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জুমার খুতবা প্রদান করেছেন হারামাইন শরিফাইনের সম্মানিত ইমাম ও খতিব শাইখ ড. আব্দুর রহমান আস-সুদাইস (হাফিযাহুল্লাহ)। খুতবাটি সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি সময়োপযোগী ও চোখ খুলে দেওয়ার মতো দলিল।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাম্প্রতিক অহেতুক কাদা ছোড়াছুড়ি ও অপপ্রচারের প্রেক্ষাপটে খুতবার সারসংক্ষেপ পয়েন্ট আকারে নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বব্যাপী বিস্তার
বর্তমান যুগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি। ঘরে কিংবা বাইরে, ভ্রমণে কিংবা অবকাশে—জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের নিত্যসঙ্গী। তাই এসব মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতি ও নৈতিকতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
২. প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও শুকরিয়া আদায়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই প্রযুক্তি মহান আল্লাহর অন্যতম বড় নিয়ামত। অন্তর, জবান ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হবে। প্রতিটি অনলাইন প্রকাশনা ও মন্তব্যের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি থাকা আবশ্যক যে, মহান আল্লাহ আমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।
৩. গুজব, অপবাদ ও নৈতিক অবক্ষয়
সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে সমাজে বিভেদ সৃষ্টিকারী নানা বিষয়, মানহানি এবং ভিত্তিহীন অপবাদের ছড়াছড়ি দেখা যায়। অজ্ঞ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব তথ্য বিশ্বাস করে ও ছড়িয়ে দেয়। এই ধরনের ভুয়া প্ল্যাটফর্ম ও ক্ষতিকর কন্টেন্ট থেকে মুমিনদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
৪. কথার জবাবদিহিতা ও জবানের হেফাজত
কথা হলো দ্বিমুখী অস্ত্র—যা কল্যাণে যেমন ব্যবহার হতে পারে, তেমনি ধ্বংসের কারণও হতে পারে। অনেক সময় সামান্য একটি মুখের কথায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন বা বান্দার পদমর্যাদা বৃদ্ধি পায়, আবার মুহূর্তের অসতর্কতায় মানুষ জাহান্নামের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়।
৫. লেখার ও প্রকাশের পূর্ণ হিসাব
মানুষ অনলাইনে যা লেখে, শেয়ার করে কিংবা রি-পোস্ট করে—তার প্রতিটি বিষয়ের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা সদা প্রস্তুত পর্যবেক্ষক নিযুক্ত করে রেখেছেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে তা সংরক্ষণের জন্য সদা প্রস্তুত একজন পর্যবেক্ষক রয়েছে।’ (সূরা কাফ: ১৮)
৬. এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ও ডিজিটাল জালিয়াতির ভয়াবহতা
আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যবহার হলো এআই ও কম্পিউটারের সাহায্যে ডিপফেক ছবি তৈরি করা, ভিডিও এডিট করা, কণ্ঠস্বর নকল করা এবং অন্য কারো নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা। শাইখ এটিকে শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘হারাম মিথ্যাচার’ এবং মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর চরম আক্রমণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
৭. অপপ্রচারের পরিণতি ও সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ
প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজে বিভ্রান্তি, অনাস্থা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। তাই কোনো সংবাদ বা ভিডিও অন্ধভাবে বিশ্বাস করে তা রি-পোস্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো অনির্ভরযোগ্য সংবাদ পেলে তা অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে, নতুবা অজ্ঞতাবশত অন্যের ক্ষতি করে পরে লজ্জিত হতে হবে।
৮. বেনামি আইডি ও ছদ্মবেশে কুৎসা রটনাকারীদের প্রতি কঠোর হুশিয়ারি
খুতবার শেষাংশে শাইখ কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন—যারা পর্দার আড়ালে বা ছদ্মনামে (Fake ID) ফেক আইডি ব্যবহার করে সৎ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ও কুৎসা রটায়, তারা যেন অবিলম্বে মহান আল্লাহর দরবারে তওবা করে ফিরে আসে। অন্যথায় তাদের মারাত্মক পাপ ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়ার বর্তমান বিভ্রান্তিকর যুগে নিজের ঈমান, আখলাক ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করতে এই খুতবার শিক্ষাগুলো প্রতিটি সচেতন মুসলমানের হৃদয়ে ধারণ করা অত্যন্ত আবশ্যক। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই কেবল দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।



