শিশুর ভেতরের সহজাত লজ্জা কীভাবে হারিয়ে যায়?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক: মানুষের মনে প্রাকৃতিকভাবেই লজ্জা ও শালীনতাবোধের যে আদিম চেতনা নিহিত রয়েছে, তা নিয়ে সম্প্রতি এক মননশীল ও চিন্তাজাগানিয়া আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার উস্তাদ নোমান আলী খান। আধুনিক গণমাধ্যম, প্রযুক্তি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের ভিড়ে মানুষের সহজাত গুণগুলো কীভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে, তা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই আলোচনায়।
দুই বা তিন বছরের একটি ছোট্ট শিশুর কথা ধরা যাক। যাকে বুদ্ধিমত্তা বা সামাজিক শিষ্টাচারের পূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন বলা যায় না, সেই শিশুটিও যখন মায়ের জামা বদলানোর সময় হঠাৎ বাবার সামনে পড়ে যায়, তখন সে অবচেতনেই লজ্জায় কম্বলের নিচে লুকিয়ে পড়ে। কেউ তাকে এই লজ্জা বা গোপনীয়তার শিক্ষা দেয়নি।
এ প্রসঙ্গে উস্তাদ নোমান আলী খান উল্লেখ করেছেন, পরস্পরের সামনে নিজেদের শরীর ও গোপনীয়তা ঢেকে রাখার এই তাগিদ মূলত প্রতিটি আদম সন্তানের স্বভাব বা ফিতরাতের ভেতরেই গভীরভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষের অন্তরে প্রাকৃতিকভাবেই লজ্জার এই পবিত্র চেতনা স্থাপন করেছেন।
কিন্তু মানবজাতিকে বিপথগামী করতে শয়তান প্রতিনিয়ত প্রলোভন ও কুমন্ত্রণা দিয়ে চলেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَزَيَّنَ لَهُمُ ٱلشَّيْطَـٰنُ أَعْمَـٰلَهُمْ
“আর শয়তান তাদের কাজগুলোকে তাদের কাছে সুশোভিত করে দেখাল।” (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত ৩৮)
ঈমানের আলো অন্তরে থাকলে আল্লাহ যাকে কুৎসিত ও মন্দ বলেছেন, মানুষ তাকে মন্দই মনে করে। কিন্তু শয়তানকে অন্তরে জায়গা করে দিলে এর উল্টোটা ঘটে। ধীরে ধীরে সমাজ এমন এক পতনের জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়, যেখানে পোশাকের আবরণ যত কম হয়, সংস্কৃতি তত বেশি ‘খোলামেলা ও আধুনিক’ হিসেবে প্রশংসিত হতে থাকে। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) আগেই এমন মানুষদের সতর্ক করে গেছেন, যারা পোশাক পরা সত্ত্বেও মূলত পোশাকহীন বা উলঙ্গ। মানবজাতির চূড়ান্ত নৈতিক বিপর্যয় তখনই ঘটে, যখন নির্লজ্জতাকে ফ্যাশন বা সৌন্দর্য হিসেবে উদযাপন করা শুরু হয়।
বর্তমানের ডিজিটাল ও বিনোদন দুনিয়া কীভাবে মানুষের নৈতিকতাকে গ্রাস করছে, তার একটি চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে রমজানের প্রেক্ষাপট টেনে। ধরুন, কোনো তরুণ প্রতিজ্ঞা করেছে যে সে রমজান মাসে পবিত্রতা রক্ষার্থে কোনো মুভি বা অশ্লীলতা দেখবে না। কিন্তু সে যখন কোনো অ্যাকশন মুভির ট্রেইলার দেখছে, যার মূল বিষয়ের সাথে অশালীনতার কোনো সম্পর্কই নেই—ঠিক তার মাঝখানেই সুকৌশলে কয়েক সেকেন্ডের একটি আপত্তিকর দৃশ্য গুঁজে দেওয়া হয়।
এর পেছনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষের মনে কুপ্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলা এবং মনের ভেতরে লোভ তৈরি করা, যেন সে বাধ্য হয়ে বলে ওঠে—”এটা আমাকে দেখতেই হবে!” আজ যা মানুষের দৃষ্টির আড়ালে এবং গোপনীয়তার মধ্যে থাকার কথা ছিল, সেটিকে আধুনিকতার মোড়কে প্রকাশ্যে উদযাপন করা হচ্ছে।
শিশুর কোমল মনে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে যে স্বাভাবিক লজ্জাবোধ ও শালীনতা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত মূল্যবান। চারপাশের এই উদযাপনের ভিড়ে ও আধুনিকতার নামে চলা অশ্লীলতার স্রোতে সেই পবিত্র আমানত যেন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে প্রতিটি অভিভাবককে সজাগ ও সতর্ক থাকার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।



