
অপরাধ বিচিত্রা ডেস্ক: কমিউনিটির নিজস্ব নেতৃত্ব, ভূখণ্ডের অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক উন্নয়নের অনন্য উদাহরণ তৈরি করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে বাংলাদেশের একটি তৃণমূল আবাসন উদ্যোগ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক ফোরামে ‘Asian Collective Housing Award 2026’ অর্জন করেছে নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার ‘জামালপুর কমিউনিটি-লেড কালেক্টিভ হাউজিং ইনিশিয়েটিভ, বাংলাদেশ’ (Jamalpur Community-Led Collective Housing Initiative, Bangladesh)।
গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ থাইল্যান্ডের ব্যাংককে দেশটির ‘Ministry of Social Development and Human Security’ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।
‘দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ’-এর সহায়তায় গড়ে ওঠা এই মডেলের সাফল্য প্ল্যাটফর্ম অব কমিউনিটি অ্যাকশন অ্যান্ড আর্কিটেকচার (POCAA)-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জমা দেওয়া হয়েছিল। এটি ‘Collective Initiatives of the Community’ ক্যাটাগরিতে এশিয়ার সেরা আবাসন উদ্যোগ হিসেবে নির্বাচিত হয়।
পুরস্কারের ক্রেস্টে প্রকল্পটিকে— “A community-managed inclusive housing project towards sustainable development” (টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কমিউনিটির ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন প্রকল্প) হিসেবে ভূষিত করা হয়েছে। পুরস্কার হিসেবে স্মারক ক্রেস্ট, আনুষ্ঠানিক সনদপত্র এবং ৩০০ মার্কিন ডলার প্রদান করা হয়। দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের পক্ষে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন POCAA প্রতিনিধি স্থপতি ফারিবা ইসলাম।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী অধ্যাপক ড. ইয়োসানান ওয়ংসাওয়াত এবং জাতিসংঘের মানববসতি কর্মসূচি (UN-Habitat)-এর নির্বাহী পরিচালক আনাক্লাউদিয়া রসবাখসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার জামালপুর (নতুন পাড়া) গ্রামে হিন্দু, মুসলিম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট ১২৩টি পরিবারের বসবাস। দীর্ঘদিনের ভূমিহীনতা ও আবাসন সংকট দূর করতে ২০০৯ সাল থেকে গ্রামের বাসিন্দারা অংশগ্রহণমূলক গণগবেষণা (Participatory Action Research—PAR) পদ্ধতিতে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেন।
গণগবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেবোত্তর ও খাসজমি সংক্রান্ত সংকট নিরসন করে ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ভূমির ওপর ৪৯টি ভূমিহীন পরিবার সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে ঘর নির্মাণ করে এক নতুন ইতিহাস গড়ে তোলে।
উদ্যোগটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোনো বাণিজ্যিক ক্ষুদ্রঋণ বা ব্যাংকিং ঋণের ওপর নির্ভরশীল নয়। গণগবেষণা সমিতির মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার মাসে ২০০ টাকা করে সঞ্চয় করে। একই সাথে কৃষিকাজ ও যৌথ পুকুর থেকে অর্জিত আয় দিয়ে তারা আবাসন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করছে। নিজেদের শ্রম, সঞ্চয় ও পারস্পরিক সহযোগিতাই এখানে উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
হিন্দুপাড়া, মুসলিম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর শতভাগ অংশগ্রহণ গ্রামটিতে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে স্থানীয় অবকাঠামো ছাড়াও শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো তারা দলগতভাবে সমাধান করে থাকেন।
আন্তর্জাতিক এই অর্জনে অনুভূতি প্রকাশ করে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের গণগবেষণা ইউনিটের প্রতিনিধি সোহেল রানা জানান, “জামালপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের এই সাফল্য সমগ্র বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের। নিজেদের নেতৃত্বে ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা, সঞ্চয় ও টেকসই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন যে, তৃণমূল মানুষই মূলত নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের প্রধান রূপকার।”
এশিয়ান কোয়ালিশন ফর হাউজিং রাইটস (ACHR)-এর কাজের বৃহত্তর কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এক দারুণ অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে রইল।



