নবী শুআইব (আ.) ও মাদইয়ান জাতির ইতিহাস

ইতিহাস ও জীবনধারা ডেস্ক: পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী হজরত শুআইব (আ.) এবং তাঁর কওম মাদইয়ানবাসীর ইতিহাস বর্তমান আধুনিক সমাজের বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটের সাথে নিবিড়ভাবে মিলে যায়। ব্যবসার ক্ষেত্রে অসততা, মাপে কম দেওয়া, নৈতিক অবক্ষয় এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক নির্দেশিকাকে অস্বীকার করার প্রবণতা—সেকালের মাদইয়ানবাসীর মাঝেও প্রকট আকারে বিদ্যমান ছিল।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ‘খাদিমুল আম্বিয়া’ বা নবীদের বক্তা হিসেবে খ্যাত হজরত শুআইব (আ.) ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশধর ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে অসাধারণ বাগ্মিতা ও প্রজ্ঞার অধিকারী করেছিলেন। মাদইয়ানবাসীর মূল অপরাধগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল— ১. শিরক বা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা।
২. অর্থনৈতিক কার্যক্রমে চরম অসততা, যেমন—মাপে ও ওজনে কম দেওয়া এবং মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।
৩. সমাজে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি, রাহাজানি এবং মুসাফিরদের ভয় দেখানো।
৪. ইসলামের প্রচার ও সত্যের পথে বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা ও ভীতি প্রদর্শন করে বাধা সৃষ্টি করা।
সেকালের সমাজে মুনাফা অর্জনের অন্ধ দৌড়ে সততা বিসর্জন দেওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নবী শুআইব (আ.) হালাল উপার্জনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কেবল বস্তুগত পরিমাণ বা বেশি উপার্জনই মূল বিষয় নয়; বরং হালাল উপার্জনের মাঝে যে অদৃশ্য ‘বারাকাহ’ বা বরকত রয়েছে, তা মানুষের জীবনে প্রকৃত প্রশান্তি, তৃপ্তি ও কল্যাণ বয়ে আনে। অসদুপায়ে অর্জিত অঢেল সম্পদের চেয়ে হালাল উপার্জনের সামান্য অংশই একজন মানুষের জন্য অধিক কল্যাণকর বলে শিক্ষায় উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদইয়ানবাসীর চিন্তাচেতনার সাথে বর্তমান আধুনিক যুগের কিছু সামাজিক প্রবণতার গভীর মিল রয়েছে। সেকালের নেতারা যেমন ধর্মকে কেবল ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও সমাজ পরিচালনায় ধর্মের কোনো হস্তক্ষেপ মেনে নিতে নারাজ ছিল, বর্তমান কালেও ঠিক একই ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামবিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা লক্ষ্য করা যায়। সত্য ও ন্যায়ের পথে আহ্বানকারী দাঈ বা সংশোধকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নেতিবাচক ট্যাগ লাগিয়ে তাঁদের কোণঠাসা করার চেষ্টা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে।
কুরআনে বর্ণিত বর্ণনা অনুযায়ী, বারবার সতর্ক করার পরও যখন মাদইয়ানবাসী তাদের অন্যায় ও অহংকার থেকে ফিরে আসেনি, তখন তাদের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসে। তীব্র গরম ও গুমোট আবহাওয়ার পর এক বিকট শব্দ এবং প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের মাধ্যমে সমগ্র কওম ধ্বংস হয়ে যায়।
ইতিহাসের এই শিক্ষণীয় ঘটনাগুলো বর্তমান যুগের মানবজাতির জন্য নৈতিক ও আত্মিক সচেতনতা তৈরির এক অবধারিত বার্তা বহন করে, যা সমাজ সংশোধনে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।



