কুয়াকাটায় বেড়িবাঁধ ও জিওটিউব ক্ষতিগ্রস্ত করে বিজ্ঞাপন সাইনবোর্ড স্থাপন

আনোয়ার হোসেন আনু (পটুয়াখালী প্রতিনিধি): পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁদের দুই পাশে অর্ধশতাধিক বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ডের ফ্রেম স্থাপনের ফলে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে সৈকতসংলগ্ন বেড়িবাঁদের ওপর ঘন ঘন সাইনবোর্ড স্থাপনে বিচ এলাকা সাইনবোর্ডে ঢেকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। পৌরসভার অপরিকল্পিত বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ড স্থাপন নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, পৌর এলাকার অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ড্রেন ও মশকনিধন কার্যক্রমসহ নাগরিক সেবার দিকে নজর না দিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ড স্থাপনের দিকে ঝুঁকেছে। সৈকতের প্রবেশপথ ও চৌরাস্তা বিলবোর্ড এবং সাইনবোর্ডে ঢেকে ফেলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সমুদ্রসৈকতের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ না করে এ ধরনের অযাচিত উন্নয়ন কার স্বার্থে—এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাঁধ রক্ষায় ব্যবহৃত জিওটিউব ক্ষতিগ্রস্ত করে এসব ফ্রেম স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত রোববার (১ নভেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, কুয়াকাটা চৌরাস্তার পশ্চিমপাশে সৈকত রক্ষাবাঁধের হাফ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এসব বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ডের স্ট্রাকচার স্থাপন করা হয়েছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে স্থাপিত এসব সাইনবোর্ডে এলইডি বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি কুয়াকাটার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ছবি প্রচারের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুয়াকাটা পৌর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বেড়িবাঁদের দুই পাশে প্রায় অর্ধশতাধিক সাইনবোর্ডের ফ্রেম স্থাপন করা হয়েছে। তবে পাউবোর জমিতে এসব স্থাপনা নির্মাণের জন্য যথাযথ অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। বিশেষ করে বাঁধের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত জিওটিউব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রকৌশলী মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, “এটি একটি কোম্পানির সাইনবোর্ড। পাশাপাশি কুয়াকাটার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ছবিও দেওয়া হবে। অনুমতির বিষয়ে পৌর প্রশাসক স্যার ভালো বলতে পারবেন।”
পৌর প্রশাসক ও কলাপাড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তাদের কোনো আপত্তি নেই জমিতে সাইনবোর্ড স্থাপনে। এটি পৌরসভার জমি নয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি। পাউবোর এসডিই ইমরানকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। বিজ্ঞাপন কোম্পানি পৌরসভাকে বার্ষিক একটি ফি দেবে—এমন চুক্তিতে সাইনবোর্ড স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি বোর্ডে কুয়াকাটার দর্শনীয় স্থানগুলোর ছবি থাকবে। জাহানারা করপোরেশন এতে স্পন্সর করেছে। এখান থেকে আয় করা টাকা রাজস্ব খাতে জমা হবে এবং সেখান থেকে পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা হবে।”
তবে পৌর প্রশাসকের বক্তব্যের সঙ্গে পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (কলাপাড়া সার্কেল) মো. শাহ আলম বলেন, “এ বিষয়ে আমি অবগত নই। কে বা কারা এগুলো করেছেন, তা জানি না। আমাদের অনুমতি ছাড়া এটি করা সম্ভব নয়। আমি খোঁজখবর নিচ্ছি।”
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুজ্জামান বলেন, “বিষয়টি আমাকে জানতে হবে। দেখে সরকারি মনে হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি যদি কিছু করে থাকেন, তাহলে তা ভেঙে দেওয়া হবে।”
অন্যদিকে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, “পাউবোর জমিতে অনুমতি ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়। আমাদের জমিতে এ ধরনের স্থাপনা করা হয়ে থাকলে তা উচ্ছেদ করা হবে।”
পৌর প্রশাসকের দাবি, পাউবোকে অবহিত করেই সাইনবোর্ড স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন। ফলে পাউবোর পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অনুমোদন বা চুক্তি দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে তার শর্ত কী এবং জিওটিউব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অবস্থান কী, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের বৈধতা, বিজ্ঞাপন থেকে সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় এবং বেড়িবাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।



