অপরাধআইন-শৃঙ্খলা

হাঁড়কাঁপানো শীতে রাস্তার পাশে কাঁদছিল দুই ভাইবোন অবশেষে গ্রেপ্তার পাষণ্ড বাবা খোরশেদ

মুহাম্মদ জুবাইর

শীতের রাতে দুই শিশুকে ফেলে গেল নিষ্ঠুর বাবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় হৃদয়বিদারক ঘটনা

দেশজুড়ে হিমশীতল বাতাসে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ঘটে গেছে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। মাত্র চার বছরের আয়েশা আক্তার ও মাত্র ১৪ মাস বয়সী মোরশেদকে নির্মমভাবে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় তাদের বাবা মো. খোরশেদ আলম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটি ভাইরাল হলে তুমুল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পরে পুলিশ তাকে বাঁশখালী উপজেলা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে।

শীতের দাপটে গোটা দেশ যখন কাঁপছে, তখন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এক সড়কের পাশে কাঁপতে থাকা দুই শিশুকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়। হাঁড়কাঁপানো ঠাণ্ডার মধ্যেও চার বছরের ছোট্ট আয়েশা তার ১৪ মাস বয়সী ভাই মোরশেদকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছিল। যেন শেষ শক্তি দিয়ে ভাইটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল সে। এই দৃশ্য দেখেন স্থানীয় অটোরিকশাচালক মহিম উদ্দিন। মানবিক তাড়নায় তিনি শিশু দুটিকে উদ্ধার করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ঘটনার তদন্ত।

গত ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যার এই দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অসহায় দুই শিশুকে রাস্তার পাশে ফেলে যাওয়ার মতো নির্মম ঘটনার নিন্দায় ফুসে ওঠেন সাধারণ মানুষ। পরে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশু দুটিকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর শিশুদের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

চিকিৎসকরা জানান,ছোট শিশুটি জন্মগত রোগে ভুগছে এবং বড় শিশুটি চর্মরোগে আক্রান্ত।অসুস্থতা নিয়ে শীতের রাতে রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় তারা মারাত্মক ঝুঁকিতে ছিল।

পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে, দুই শিশুর বাবা মো.খোরশেদ আলম ইচ্ছাকৃতভাবেই সন্তানদের সড়কে ফেলে রেখে চলে যান।পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে খোরশেদ জানান,তাদের বাড়ি খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের মহামনি এলাকায়।

পেশায় তিনি একজন অটোরিকশাচালক এবং বাঁশখালী এলাকায় ভাঙ্গারির দোকানেও কাজ করতেন।পারিবারিক বিরোধ এবং স্ত্রীর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জেরে তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। এরপর তিনি বাঁশখালীর মিয়ারবাজার লস্করপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন।

কিন্তু পারিবারিক সমস্যা থাকলেও দুই অসহায় শিশুকে রাস্তার পাশে ফেলে যাওয়ার মতো অমানবিক সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মানবিক আচরণ বলে মেনে নিতে পারছেন না কেউই।পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে খোরশেদ স্বীকার করেন যে তিনি সন্তানদের রেখে চলে যান।আর এই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ঘটনায় খোরশেদ আলম ও তার স্ত্রী ঝিনুক আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ।আনোয়ারা থানার এসআই (নিরস্ত্র) মোমেন কান্তি দে বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুতর।শিশু দুটি বর্তমানে নিরাপদে রয়েছে এবং তাদের সুস্থতার বিষয়ে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।অনেকেই লিখেছেন,কীভাবে একজন বাবা এমন করতে পারেশিশুরা তো কোনো অপরাধ করেনি আইনের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিতমানবিক এই প্রশ্নগুলো এখন সমাজের সামনে বড় করে দাঁড়িয়ে আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন,পারিবারিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত সমস্যার দায় কোনোভাবেই শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনি অপরাধই নয়, মানবিক মূল্যবোধকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর জানিয়েছে, শিশু দুটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় আইন অনুযায়ী সব উদ্যোগ নেওয়া হবে।

হিমশীতল এই সময়ে দুই শিশুকে রাস্তার পাশে ফেলে যাওয়ার মতো অমানবিক ঘটনা সবার মনকে নাড়া দিয়েছে। আর গ্রেপ্তার হওয়া বাবা খোরশেদ আলমকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button