
বিল্লাল বিন কাশেম: বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার, সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে দারিদ্র্য দূরীকরণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও একটি টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব বারবারই লক্ষ্য করা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে যাকাতভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ- জাতীয় যাকাত কাউন্সিল—নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় শিগগিরই আত্মপ্রকাশ করতে যাওয়া এই কাউন্সিল দেশের যাকাত ব্যবস্থাপনাকে একটি নতুন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নির্দেশনায় আলেম সমাজ, প্রশাসন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে যাকাতকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে।
যাকাত: শুধু দান নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক দর্শন ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ যাকাত কেবল একটি দানব্যবস্থা নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামো, যার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা হয়। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান কমানো, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করে তোলাই যাকাতের মূল লক্ষ্য।
ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে যাকাত এমন একটি শক্তিশালী উপায়, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপিত হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। ইতিহাসে এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আমাদের দেশে সেই কাঙ্ক্ষিত প্রয়োগ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: অতীতের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর অধীনে জাতীয় যাকাত বোর্ডের মাধ্যমে যাকাত কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে যাকাত সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকসহ নিম্ন ও মধ্য আয়ের কর্মচারীদের কাছ থেকে যাকাত আদায়ের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
এছাড়া যাকাত বিতরণ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ছিল। প্রাপ্ত অর্থ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ভোগে ব্যয় হয়ে গেছে- যা দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। ফলে যাকাতের মূল উদ্দেশ্য- স্বাবলম্বিতা অর্জন—বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি।
নতুন উদ্যোগ: সমন্বিত কাঠামোর সম্ভাবনা জাতীয় যাকাত কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এতে ওলামায়ে কেরাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক, মাদ্রাসা ও মসজিদের ইমাম-খতিবদের সমন্বয়ে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে।
এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে যাকাত সংগ্রহ এবং তা পরিকল্পিতভাবে বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে করে একদিকে যেমন যাকাত সংগ্রহ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কায়কোবাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর মহাপরিচালক আঃ ছালাম খান এবং আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান আহমোদুল্লাহসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এই উদ্যোগের গুরুত্বকেই প্রতিফলিত করে।
দারিদ্র্য বিমোচনে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দারিদ্র্য বিমোচন কেবল অর্থ বিতরণের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা। জাতীয় যাকাত কাউন্সিল সেই জায়গাতেই পরিবর্তন আনতে পারে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, যাকাতের অর্থকে শুধু ভোগের জন্য নয়, বরং উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করার চিন্তা করা হচ্ছে। যেমন-
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি
কর্মসংস্থান সৃষ্টি
দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ
পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: সফলতার পূর্বশর্ত
যেকোনো উদ্যোগের সফলতার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। জাতীয় যাকাত কাউন্সিলের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল ডাটাবেইজ, উপকারভোগীদের নিবন্ধন, অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং নিয়মিত অডিটিংয়ের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব। এতে করে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ ও নতুন কাঠামো গঠনের নির্দেশনা থেকে বোঝা যায় যে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সঠিক তদারকি এবং নিয়মিত মূল্যায়ন অপরিহার্য।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
জাতীয় যাকাত কাউন্সিল গঠন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
সঠিক উপকারভোগী চিহ্নিতকরণ
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা
প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা
জনসচেতনতা বৃদ্ধি
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হলে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা, শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
জাতীয় যাকাত কাউন্সিল কেবল একটি নতুন প্রতিষ্ঠান নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের একটি নতুন দৃষ্টান্ত। যদি এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে যাকাতভিত্তিক একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, যা সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সবশেষে বলা যায়, পরিকল্পনা নয়—বাস্তবায়নই হবে এই উদ্যোগের প্রকৃত পরীক্ষার মাপকাঠি। এখন সময় এসেছে যাকাতকে একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপান্তর করার, যেখানে দান নয়, উন্নয়নই হবে মূল লক্ষ্য।
লেখক: কবি, গল্পকার ও গণসংযোগবিদ



