মুহাম্মাদ জুবাইর: চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানা পুলিশের একটি সফল ও ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ অভিযানে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের একটি বড় চক্রের অংশ উন্মোচিত হয়েছে। এ অভিযানে ১,০৫,০০০ (এক লক্ষ পাঁচ হাজার) পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয় এবং ২ জন পেশাদার মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত ইয়াবার আনুমানিক ওজন প্রায় ১০ কেজি।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ০৫ মে ২০২৬ তারিখে পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) কাজী মনিরুল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি চৌকস টিম, সংগীয় এএসআই ও কনস্টেবলদের নিয়ে কোতোয়ালী থানাধীন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিশেষ চেকপোস্ট ডিউটি পালন করছিল। এ সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারেন যে, কক্সবাজার থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট ঢাকার উদ্দেশ্যে পাচার করা হচ্ছে।
এ তথ্য পাওয়ার পরপরই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হলে উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ), অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) এর সার্বিক দিকনির্দেশনায় দ্রুত অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অফিসার ইনচার্জ, কোতোয়ালী থানার নেতৃত্বে একটি সমন্বিত টিম গঠন করে নতুন ব্রিজঘাট সংলগ্ন মেরিনার্স রোডের পুরাতন ফিশারিঘাট এলাকায় কৌশলগতভাবে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়।
রাত আনুমানিক ১১:৪৫ মিনিটে কক্সবাজারমুখী একটি সাদা রঙের অ্যাম্বুলেন্স (রেজি: ঢাকা মেট্টো-ছ-৭১-১২৬৫) সন্দেহজনকভাবে ওই এলাকায় প্রবেশ করলে পুলিশ গাড়িটিকে থামার সংকেত দেয়। কিন্তু চালক পুলিশের সংকেত অমান্য করে হঠাৎ ইউ-টার্ন নিয়ে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। এতে পরিস্থিতি আরও সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।
তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সদস্যরা সরকারী গাড়ি (লিমা-২১) ব্যবহার করে ধাওয়া শুরু করে। কয়েক মিনিটের নাটকীয় ধাওয়ার পর কোতোয়ালী থানাধীন পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়ির পশ্চিম পাশে ব্রিকফিল্ড রোডস্থ একটি কালভার্টের উপর অ্যাম্বুলেন্সটি আটক করা হয়।
এ সময় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা দুই ব্যক্তি চালকের আসনে থাকা শহিদুল ইসলাম খান সাগর (২৭) এবং তার পাশে বসা মোঃ আফসার (৩৩) পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। তবে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের তৎপরতায় তাদের দ্রুত আটক করা সম্ভব হয়।
পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে স্থানীয় লোকজন, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত হন। তাদের উপস্থিতিতে আটককৃত অ্যাম্বুলেন্সটি তল্লাশি করা হয়। তল্লাশির এক পর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্সের ভিতরে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডারের মধ্যে অত্যন্ত কৌশলে লুকানো অবস্থায় ইয়াবার বড় চালান পাওয়া যায়।
আটককৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তারা নিজেরাই গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতর থেকে ইয়াবাগুলো বের করে দেয়। সেখান থেকে মোট ১,০৫,০০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক ওজন প্রায় ১০ কেজি। এছাড়া মাদক পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্সটি জব্দ করা হয় এবং আসামিদের কাছ থেকে ২টি মোবাইল ফোন (Realme RMX5566 ও Vivo 1951 মডেল) উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আটককৃতরা একটি সংঘবদ্ধ মাদক পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য এবং দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ইয়াবা সরবরাহ করে আসছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তারা অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি সেবার যানবাহন ব্যবহার করতো, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়।
এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ৩৬(১) এর ১০(গ)/৩৮/৪১ ধারায় কোতোয়ালী থানায় মামলা (নং-০৯, তারিখ-০৫/০৫/২০২৬) রুজু করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য পলাতক সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে ভবিষ্যতে এ ধরনের কৌশলী মাদক পাচার রোধে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানানো হয়, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং যেকোনো মূল্যে মাদক চক্রকে আইনের আওতায় আনা হবে।



