পবিত্র সিয়ামের বা রোজার গুরুত্ব ও বিধান
ধর্ম ডেস্ক: ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে সিয়াম বা রোজা অন্যতম। এটি কেবল আত্মসংযমের মাধ্যমই নয়, বরং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য ইবাদত। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাক্বারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে তোমরা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করতে পারো।” এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মনে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা এবং চরিত্রকে সংশোধন করা।
কুরআন নাজিলের মাস ও সহজ বিধান: রমজান মাস মূলত কুরআন নাজিলের মাস। সূরা বাক্বারার ১৮৫ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, এই মাসটি মানবজাতির হিদায়াতের পথপ্রদর্শক। যারা সুস্থ ও স্থায়ী অবস্থানে থাকবেন, তাদের জন্য পুরো মাস রোজা রাখা বাধ্যতামূলক। তবে ইসলাম একটি সহজ ও জীবনঘনিষ্ঠ ধর্ম। তাই অসুস্থ ব্যক্তি বা মুসাফিরদের জন্য সিয়ামের বিধানে শিথিলতা আনা হয়েছে। তারা পরবর্তী সময়ে এই রোজা পূর্ণ করতে পারবেন। যারা স্থায়ীভাবে রোজা রাখতে অক্ষম, তাদের জন্য ‘ফিদিয়া’ বা মিসকিনকে অন্নদানের বিধান রাখা হয়েছে (আয়াত: ১৮৪)। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য বিধান সহজ করতে চান, কোনো কঠোরতা নয়।
হাদিসের আলোকে রোজার মাহাত্ম্য
রাসূলুল্লাহ (সা.) সিয়ামের অশেষ ফজিলত বর্ণনা করেছেন। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে (২৬০৩) বলা হয়েছে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কেউ যদি একদিন রোজা রাখে, আল্লাহ তার চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে সত্তর বছরের পথ দূরে সরিয়ে দেবেন। এছাড়া সহিহ বুখারীর (১৮৯৪) বর্ণনা অনুযায়ী, রোজা হলো মুমিনের জন্য ‘ঢাল’ স্বরূপ। এটি মানুষকে অশ্লীলতা ও মূর্খতা থেকে রক্ষা করে। এমনকি রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও প্রিয়। এই ইবাদতটি সরাসরি আল্লাহর জন্য, তাই তিনি নিজেই এর প্রতিদান দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন।
পরকালীন পুরস্কার ও বিশেষ সুযোগ
জান্নাতে প্রবেশের জন্য রোজাদারদের জন্য ‘রাইয়্যান’ নামক একটি বিশেষ দরজা বরাদ্দ থাকবে, যা দিয়ে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না (বুখারী: ১৮৯৬)। রমজান মাস শুরু হলেই আসমানের রহমতের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নাম বন্ধ করা হয় এবং শয়তানকে শিকলবন্দী করা হয়। ঈমান ও সওয়াবের আশায় যারা এই মাসে সিয়াম পালন করবে এবং লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদত করবে, তাদের পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয় (বুখারী: ১৯০১)।
সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান
রমজানের রাতে পানাহার ও পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে ইসলামে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সূরা বাক্বারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে রোজার রাতের সময়টুকুতে পারিবারিক সাহচর্য এবং সুবহে সাদিক পর্যন্ত পানাহার বৈধ করা হয়েছে। এছাড়া রমজানে একটি ওমরাহ পালন করা হজের সমপরিমাণ সওয়াবের কাজ (নাসায়ী: ২১১০)। সিয়ামের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রমজান পরবর্তী শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, যা পুরো বছর রোজা রাখার সওয়াব এনে দেয় (মুসলিম: ২৬৪৮)।
পরিশেষে বলা যায়, রোজা কেবল না খেয়ে থাকা নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও শৃঙ্খলার এক মহান পাঠশালা। আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলে একনিষ্ঠভাবে রোজা পালনের মাধ্যমেই একজন মুমিন প্রকৃত সফলকাম হতে পারেন।



