অনুসন্ধানঅপরাধকুমিল্লাদুর্নীতি

কুমিল্লার সুয়াগাজি ফরেস্ট চেক স্টেশনে তিন জনের যোগসাজশে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

এম শাহীন আলম: কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজি ফরেস্ট চেক স্টেশনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে টিপি (ট্রানজিট পাস) চেকের নামে প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য চলছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী, গাড়িচালক, চালানদার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বনজ পণ্যবাহী গাড়ি পার হতে হলে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। টাকা না দিলে গাড়ি আটকে রেখে হয়রানি, মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো এবং নানা অজুহাতে ভোগান্তি সৃষ্টি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই ঘুষ বাণিজ্যের পেছনে চেক স্টেশনের স্টেশন অফিসার নাজমুলের প্রত্যক্ষ তদারকি এবং ফরেস্ট গার্ড আবুল কালাম আজাদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জি এম মোহাম্মদ কবিরের নীরব সমর্থনেই এই অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চলমান রয়েছে।

সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজারসহ পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকা থেকে কাঠ, বাঁশ, ফুলের ঝাড়ু, মৌসুমি ফলসহ বিভিন্ন বনজ পণ্যবাহী ট্রাক কুমিল্লা হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। এসব গাড়ি সুয়াগাজি ফরেস্ট চেক স্টেশনে এসে টিপি চেকের নামে থামানো হয়।
গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় গাড়ির কাছে কোনো কর্মকর্তা যান না। চালানদার বা ড্রাইভার নিজেই কাগজপত্র নিয়ে অফিসে গিয়ে নির্ধারিত অংকের টাকা দিয়ে সিল-স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, ছোট গাড়ি থেকে শুরু করে বড় ট্রাক পর্যন্ত প্রতিটি যানবাহন থেকে ২২০০ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী জানান, আমরা সরকারকে নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স দিই। তারপরও প্রতিটি চেক স্টেশনে আলাদা করে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে গাড়ি ছাড়ে না, উল্টো নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনেক সময় অবৈধ কাঠবোঝাই গাড়িও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটক রাখা হয়। পরে ‘রফা’ হলে সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়। আর সমঝোতা না হলে মামলা দেওয়া হয়। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি বনজ সম্পদ রক্ষার মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এই চেক স্টেশন কার্যত সরকারি রাজস্ব আদায়ের কেন্দ্র না হয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক ঘুষ আদায়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বন বিভাগের গোপন ও বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, এই চেক স্টেশনে একজন স্টেশন অফিসার সহ ফরেস্ট গার্ড ও স্টেশনে সংশ্লিষ্ট সকলেই পোস্টিং নিতে হলে বন বিভাগের হেড অফিসের কর্মকর্তাদের মোটা অংকের ঘুষের মাধ্যমে ম্যানেজ করে মাত্র ১ বছরের জন্য পোস্টিং নিয়ে আসতে হয়। যার কারণে তারা এই ঘুষের টাকা উঠাতে বেপরোয়া হয়ে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যায়।
আরো জানা যায়, এই ঘুষ বাণিজ্যের টাকার ভাগ শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, কুমিল্লার বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিএফ (কনজারভেটর অব ফরেস্টস) এবং প্রধান বন সংরক্ষক পর্যন্ত এই অর্থের ভাগ পৌঁছে যায়।
বন বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্টেশনের ঘুষ বাণিজ্যের ভাগ পৌঁছানোর কারণেই পত্রিকা ও টেলিভিশনে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বরং প্রতিবারই তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার নেই
কুমিল্লা নগরীর শাকতলা বিভাগীয় বন অফিসে একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সাংবাদিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও কর্তৃপক্ষ শুধু আশ্বাস দিয়েই দায় শেষ করেছে বলে অভিযোগ।
এক ব্যবসায়ী বলেন, প্রতি বছর একই সমস্যা। সবাই জানে, সবাই দেখে, কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয় না। কারণ উপরের দিক পর্যন্ত সবাই নাকি এর সঙ্গে জড়িত।

এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে সুয়াগাজি চেক স্টেশনের স্টেশন অফিসার নাজমুলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি।
পরে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এবং সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের দাবি, সুয়াগাজি ফরেস্ট চেক স্টেশনে টিপি চেকের নামে চলা এই প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্যের নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় বন বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।
এ বিষয়ে পরবর্তী অনুসন্ধানে আরও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button