অনুসন্ধানদেশ

চুয়াডাঙ্গায় অবৈধ প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকে সেবার নামে অপচিকিৎসা

শিমুল রেজা: চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় নিউ ডিজিটাল প্রাইভেট হাসপাতাল এন্ড শোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতারণা ও জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য আইনের তোয়াক্কা না করে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কোনো অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কর্মরত না থাকলেও প্রায় চার মাস আগে চাকরি ছেড়ে যাওয়া টেকনোলজিস্ট মেহেদী হাসানের নাম, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগের পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদান করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষানিরীক্ষা করিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেই গড়ে ওঠা নিউ ডিজিটাল প্রাইভেট হাসপাতাল অ্যান্ড শোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি নিয়ম বহির্ভূতভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিবর্তে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা এবং ভুল রিপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ সূত্রে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য আইন অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত টেকনোলজিস্ট ছাড়া প্যাথলজি ল্যাব পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধিত টেকনোলজিস্ট ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সাবেক কর্মরত টেকনোলজিস্টের নাম ও পদবী ব্যবহার করে অন্য কেউ রিপোর্টে স্বাক্ষর করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের সাবেক টেকনোলজিস্ট মেহেদী হাসান প্রায় চার মাস আগে চাকরি ছেড়ে চলে গেলেও এখনও তার নাম, পদবী ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে রোগীদের রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। বিষয়টি জানানো হলে মেহেদী হাসান বলেন, “আমি উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানে প্রায় চার মাস আগে কর্মরত ছিলাম। এখন আর নেই। আমার নাম, পদবী ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে রিপোর্ট দেওয়া হলে সেটা কঠিন ও আইনগত অপরাধ। এ বিষয়ে আমি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।”

সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্টের পরিবর্তে অদক্ষ কর্মী দিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করানোর কারণে ভুল রিপোর্টের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। এতে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।

স্থানীয়রা বলেন, “স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন টেকনোলজিস্ট চলে যাওয়ার পরও তার নামে রিপোর্ট তৈরি হওয়া মানে ভুয়া রিপোর্ট ও ডকুমেন্ট জালিয়াতি। রোগী মনে করছেন তিনি অভিজ্ঞ টেকনোলজিস্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করিয়েছেন, অথচ বাস্তবে তা হয়নি। এটি অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”

এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মশিউর রহমান বলেন, “প্যাথলজির কার্যক্রম চালাতে হলে অবশ্যই বৈধ কাগজপত্র ও নিবন্ধিত প্যাথলজিস্ট থাকতে হবে। কারও সিল-স্বাক্ষর জাল করা সম্পূর্ণ বেআইনি। নিয়ম বহির্ভূত কাজ করলে লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।”

দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. উবায়দুর রহমান সাহেল বলেন, “এটি গুরুতর অপরাধ। কোনোভাবেই এ ধরনের কাজ করার সুযোগ নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অভিযোগের সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালাও করা হতে পারে।”

চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. হাদি জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, “এটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী প্যাথলজিতে যোগ্য প্যাথলজিস্ট থাকতে হবে। তা না থাকলে কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রাইভেট ক্লিনিক নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে, এমন অভিযোগ সামনে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলছে, স্বাস্থ্যসেবার মতো স্পর্শকাতর খাতে এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রতারণাই নয়, এটি সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button