ফকির বাজার কলেজে ৬ মাসের অ্যাডহক কমিটি: অদক্ষ ও রাজনৈতিক সভাপতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘ফকির বাজার হাই স্কুল এন্ড কলেজ’-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, কুমিল্লার প্রবিধানমালা ২০২৪-এর অনুচ্ছেদ ৬৪(৪) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত ১৬/০৩/২০২৬ তারিখের স্মারক অনুযায়ী একটি ৪ সদস্যের ‘অ্যাডহক’ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে কমিটির সভাপতি নির্বাচন এবং বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অনুমোদিত কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মনোনীত হয়েছেন জনাব শাহরিয়ার হোসেন (লিমন)। তিনি এই স্কুলেরই ২০০৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং জঙ্গলবাড়ী আবদুস সাত্তার চেয়ারম্যানের কনিষ্ঠ পুত্র। তার বড় ভাই জসিম উদ্দিন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
অভিযোগ উঠেছে, শাহরিয়ার হোসেন লিমনের ব্যক্তিগত বা জাতীয় জীবনে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন নেই যা তাকে একটি উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতির আসনে বসাতে পারে। তিনি কোনো উচ্চতর ডিগ্রিধারী নন, এমনকি শিক্ষা ক্ষেত্রেও তার কোনো পূর্ব অবদান নেই। রাজনীতিবিদদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পূর্বে তাকে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় দেখা যায়নি; তবে পটপরিবর্তনের পর তিনি উপজেলা বিএনপির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদকের পদ পান। একজন ‘অরাজনৈতিক’ ও ‘শিক্ষাবিদ’ ব্যক্তির পরিবর্তে রাজনৈতিক তকমাধারী একজনকে সভাপতি করায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে।
ফকির বাজার স্কুলের প্রাক্তণ শিক্ষার্থীদের তালিকায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সাইফুল ইসলাম, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যাপক ডা. ইজাজুল হক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র দেব, কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড মডেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আবুল হোসেনসহ অসংখ্য দেশবরেণ্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও ব্যাংকার। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—এতো বিপুল সংখ্যক শিক্ষাবিদ ও মেধাবী ব্যক্তিত্ব থাকতে কেন একজন স্বল্প শিক্ষিত ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হলো?
ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের দিক দিয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চল্লিশ মৌজার এই বিদ্যাপীঠটি এখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের কয়েকটি পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার হোসেনের মেজ ভাই বিল্লাল হোসেন এই স্কুলেরই হিসাব সহকারী। অভিযোগ রয়েছে, স্কুলের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন এই ‘কেরানী’ বিল্লালের হাতে। তার প্রভাবে শিক্ষকরাও এখন পাঠদানের চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সক্রিয়। অনেক শিক্ষক ভয়ে ও আতঙ্কে বিল্লালের নেতৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে স্কুলের সম্পদ অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্কুলের মাঠ ব্যবহার করে গরুর বাজার বসানো এবং স্কুলের মার্কেটের দোকানগুলো নামমাত্র ভাড়ায় বা বিনা ভাড়ায় রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলেও চরম দলীয়করণ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সচেতন মহলের মতে, তখন শিক্ষকরা কিছুটা স্বাধীন থাকায় ফলাফলের মান তুলনামূলক ভালো ছিল। অতীতে রহিম স্যার, আব্দুল গফুর স্যার বা তারেক স্যারের মতো গুণী শিক্ষকদের পদচারণায় স্কুলটি মুখরিত ছিল। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিক মেরুকরণে শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি চরমে পৌঁছেছে। স্কুলের একটি পক্ষ কেরানী বিল্লালের আড়ালে সক্রিয় থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত করেছে।
এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা মনে করছেন, এভাবে চলতে থাকলে স্কুলটি তার গৌরব হারাবে এবং মেধাবী বিসিএস ক্যাডার বা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। আদর্শহীন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে স্কুলের পড়াশোনার পরিবেশ ধ্বংসের মুখে। এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের সুনাম ফেরাতে এবং সঠিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতে অবিলম্বে গুণীজন, প্রকৃত শিক্ষাবিদ ও নির্দলীয় মেধাবীদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন নাগরিকবৃন্দ।



