লেখকের আড়ালে ‘ভূমিদস্যু’ হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়ার অপরাধের আমলনামা ও ছদ্মবেশী জীবন

হাবিব সরকার স্বাধীন: উত্তরা, দক্ষিণখান ও উত্তরখান এলাকায় সাধারণ মানুষের জমি গ্রাস আর জালিয়াতির একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন দলিল লেখক থেকে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়া হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া। ভুয়া নথিপত্র তৈরি, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং নিজস্ব ‘লাঠিয়াল বাহিনী’র মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি-বেসরকারি জমি দখল করাই এই চক্রের প্রধান পেশা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর হত্যা মামলার আসামি হয়েও বর্তমানে এক রহস্যময় ‘ছদ্মবেশী’ জীবনযাপন করছেন এই অপরাধচক্রের হোতা।
১. দলিল লেখকের আড়ালে ভূমিদস্যুতার উত্থান
অনুসন্ধানে জানা যায়, হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া উত্তরা, দক্ষিণখান ও উত্তরখান সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কেন্দ্রিক একজন সাধারণ দলিল লেখক হিসেবে কাজ শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই জালিয়াতি চক্র গড়ে তোলেন।
ভুয়া নথিপত্র তৈরি: সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে এবং জমির ভুয়া বা জাল পিটদলিল (Chain Deeds) তৈরি করে কোটি কোটি টাকা মূল্যের জমি গ্রাস করাই ছিল তার মূল কৌশল।
দখলদারিত্বের হটস্পট: মারইয়াম Plaza, ভুইয়া মার্কেট এবং আশিয়ান সিটির আশপাশের মূল্যবান খাস জমি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা জোরপূর্বক দখল করে এই চক্রটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
২. রাজনৈতিক আশ্রয় ও নাঈম সিন্ডিকেটের ‘আস্থাভাজন’
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (DNCC) ৪৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক বিতর্কিত কাউন্সিলর ও সন্ত্রাসী আনিছুর রহমান নাঈমের প্রধান আর্থিক যোগানদাতা ও ভূমি দখল বিষয়ক পরামর্শদাতা (Advisor) ছিলেন এই হুমায়ুন কবীর।
সাবেক কাউন্সিলর নাঈমের লাঠিয়াল বাহিনী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে ব্যবহার করে তিনি কাওলা, যমুনা, বসুন্ধরা, আশিয়ান ও বনরূপা এলাকায় একক রাজত্ব কায়েম করেন।
সরকারি খাস জমি এবং সাধারণ মানুষের পৈতৃক সম্পত্তি দখল করে নাঈম ও হুমায়ুন সিন্ডিকেট ভাগাভাগি করে নিতো বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
৩. জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (জুলাই আন্দোলন) সময় উত্তর ও দক্ষিণখান এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক কাউন্সিলর নাঈমের সাথে হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া এবং তার ছেলেও সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনের পর দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা মামলায় তারা পিতা-পুত্র দুজনেই এজাহারনামীয় আসামি।
৪. সিসিটিভি নজরদারি ও কথিত সাংবাদিকদের ‘মাসোহারা’র ভিডিও ফাঁস
মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে এক রহস্যময় জীবন পার করছেন এই ভূমিদস্যু। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তাকে ‘খুঁজে পাচ্ছে না’ বা তিনি পলাতক রয়েছেন বলে দাবি করলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পর্দার আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ: ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি এখনো পর্দার আড়াল থেকে তার মূল ব্যবসা ও অফিসের কার্যক্রম সর্বক্ষণ পরিচালনা করছেন।
সিসিটিভি নেটওয়ার্ক: পুরো কাওলা ও আশপাশের এলাকা নিজস্ব সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার নেটওয়ার্ক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা কোনো অপরিচিত ব্যক্তি এলাকায় প্রবেশ করলে তিনি আগেভাগেই সতর্ক হতে পারেন।
হলুদ সাংবাদিকদের ব্যবহার ও ভিডিও প্রমাণ: নিজের অপরাধ আড়াল করতে তিনি টাকার বিনিময়ে কিছু নামধারী ও কথিত হলুদ সাংবাদিক এবং দালাল চক্রকে সবসময় সাথে রাখছেন। সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের কথিত সংবাদকর্মী ও উমেদারদের (দালাল) অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, জমির দালালি ও জালিয়াতির সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে এই কথিত সাংবাদিকদের নিয়মিত মাসোহারা ও বকশিশ দেওয়া হচ্ছে, যারা বর্তমানে সামাজিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে কবিরের পক্ষে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
৫. নামজারি জালিয়াতি, রাজস্ব ফাঁকি ও খাস জমি গ্রাস
এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ও জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
ভুয়া নামজারি (Mutation) সিন্ডিকেট: সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং নিজস্ব উমেদারদের ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জমির ভুয়া নামজারি করিয়ে নিতো এই চক্রটি। যার স্পষ্ট প্রমাণ ও ভিডিও রেকর্ড এখন সংরক্ষিত রয়েছে।
রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন: রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি, জমির ভুয়া মূল্য দেখানো এবং সরকারি অর্পিত সম্পত্তি (Vested Property) ও খাস জমি লিজ নেওয়ার নামে স্থায়ীভাবে দখল করে নেওয়ার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে।
এলাবাসীর দাবি ও গোয়েন্দা নজরদারি
হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়ার এই দ্বিমুখী ও বিভ্রান্তিকর জীবনের অবসান ঘটাতে এবং তার তাসের ঘর ভেঙে দিতে স্থানীয় বাসিন্দারা দেশের সর্বোচ্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা—এনএসআই (NSI) ও ডিজিএফআই (DGFI)-এর জরুরি intervention কামনা করেছেন। তাদের দাবি, একটি সুষ্ঠু ও নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে এই ছদ্মবেশী দলিল লেখক, তার দালাল চক্র এবং কথিত হলুদ সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা হলে উত্তরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষা পাবে।



