ইসলাম ধর্ম

আবর্জনার স্তূপে বসা এক পাগলের উপদেশে কাঁদলেন প্রতাপশালী খলিফা হারুনুর রশিদ

ইসলামিক ডেস্ক: ইতিহাসের পাতায় আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগের খলিফা হারুনুর রশিদের বীরত্ব ও শাসনের অনেক কাহিনী বর্ণিত আছে। তবে তাঁর জীবনের অন্যতম এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ঘটেছিল এক হজের সফরে, যা আজও ক্ষমতার দম্ভে মত্ত মানুষের জন্য এক বিশাল শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

সফর চলাকালে রাস্তার পাশে এক আবর্জনার স্তূপের ওপর বসা এক ব্যক্তিকে দেখে খলিফা তাঁর রাজকীয় কাফেলা থামানোর নির্দেশ দেন। লোকটির নাম ছিল বহলুল (রহ.)। তিনি ছিলেন এক উচ্চপদস্থ আধ্যাত্মিক সাধক বা ‘আরেফ বিল্লাহ’, যদিও তাঁর সাদামাটা জীবনযাপন দেখে সাধারণ মানুষ তাঁকে ‘পাগল’ বলে মনে করত।

খলিফার দেহরক্ষীরা যখন রাস্তা পরিষ্কারের জন্য হম্বিতম্বি করছিল, তখন বহলুল (রহ.) উচ্চস্বরে খলিফাকে ডাক দিয়ে বসেন। খলিফা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সাড়া দিলে বহলুল তাঁকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাধারণ জীবনযাপনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসূল (সা.) অত্যন্ত সাধারণ উটে চড়ে পথ চলতেন, কাউকে পথ থেকে সরানোর জন্য জবরদস্তি করতেন না। আপনার এই রাজকীয় জাঁকজমক কি আল্লাহর দরবারে আপনার মর্যাদা বাড়াবে? মনে রাখবেন, বিনয়ই শাসকের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার।”

সাধকের এই সত্যবাণী তীরের মতো খলিফার হৃদয়ে বিঁধল। তিনি ঘোড়া থেকে নেমে ডুকরে কেঁদে উঠলেন এবং আরও কিছু উপদেশ চাইলেন। তখন বহলুল (রহ.) এক মর্মস্পর্শী কবিতার মাধ্যমে খলিফাকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “পুরো পৃথিবীটা আপনার হাতের মুঠোয় এলেও লাভ কী? শেষ পর্যন্ত আপনার ঠিকানা তো হবে ওই অন্ধকার কবরের গর্ত। আজ যে দেহের এত যত্ন করছেন, কাল সেখানে কেবল মাটির রাজত্ব থাকবে।”

খলিফা হারুনুর রশিদ আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং বহলুলকে জাগতিক কোনো সাহায্য বা ঋণের বোঝা মিটিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। উত্তরে বহলুল (রহ.) মুচকি হেসে খলিফাকে আত্মশুদ্ধির এক বড় সবক দিলেন। তিনি বললেন, “আপনি কি মানুষের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের টাকা দিয়ে আমার ঋণ শোধ করতে চান? ঋণ দিয়ে কখনো ঋণ শোধ হয় না। আপনি বরং মানুষের হক তাদের ফিরিয়ে দিন এবং নিজের আমলের হিসাব দিন।”

খলিফা যখন তাঁর জন্য স্থায়ী মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করতে চাইলেন, তখন বহলুল আকাশের দিকে আঙুল তুলে এক অসামান্য নির্ভরতার পরিচয় দিলেন। তিনি বললেন, “যিনি আপনাকে রিযিক দেন, তিনি কি আমাকে ভুলে গেছেন যে আমার জন্য আপনার ভাতার মুখাপেক্ষী হতে হবে?”

ইতিহাসের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা বা বৈভব কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। খলিফার রাজপ্রাসাদ আর বহলুলের আবর্জনার স্তূপ—উভয়ের চূড়ান্ত গন্তব্য সাড়ে তিন হাত মাটি। তাই ক্ষমতার মোহে অন্ধ না হয়ে পরকালের সঠিক পাথেয় সংগ্রহ করাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। এই ঐতিহাসিক শিক্ষা আজও প্রতিটি শাসক ও সাধারণ মানুষের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button