
নিজস্ব প্রতিবেদক: চেয়ারম্যান শাতিলের বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ। দেশের অন্যতম শীর্ষ সমবায় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিঃ (মিল্কভিটা) চরম প্রশাসনিক ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অন্তবর্তী কালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান এস.এম. আমির হামজা শাতিল ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জাহিদুল ইসলামসহ সিন্ডিকেট এর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, অন্যায় অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে সাধারণ সমবায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এর প্রেক্ষিতে সমবায় অধিদপ্তরসহ সরকারের ১১টি উচ্চ পর্যায়ের দপ্তরে গত ১০ জুন লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মিল্কভিটার শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকার আর্থিক লুটপাটে জড়িত। গত ৩ জুন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক বরাবর চার পৃষ্ঠার একটি অভিযোগনামা প্রমাণসহ সমবায়দের পক্ষ থেকে দাখিল করা হয়। এরপর গত ১০ জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১১টি দপ্তরে এ অভিযোগ পাঠানো হয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যান শাতিল সমবায় আইন ও মিল্কভিটার গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে বেআইনিভাবে ক্ষমতার দম্ভ দেখাচ্ছেন। পূর্বে কোন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তার মত একজন অনভিজ্ঞ লোককে মিল্কভিটার মত সুনামধন্য একটি জাতীয় সমবায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য এক বছরের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, বেআইনিভাবে তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে নিজের খেয়াল খুশি মত একক সিদ্ধান্ত, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রান্তিক দুগ্ধ খামারীদের সাথে অশোভন আচরণ এবং কথায় কথায় প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে সবাইকে ভয় ভীতি দেখাচ্ছেন। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগে নানান কুটকৌশলে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া করার লক্ষ্যে গত ৬ জুন ২০২৬ তারিখে বেআইনিভাবে একটি বিশেষ সাধারণ সভা (EGM) ডাকা হয়। এই সভায় তার সম্মানী ভাতা ১০ গুণ বৃদ্ধি, শ্রমিক ছাঁটাই করে আউটসোর্সিং বাণিজ্য এবং চাকুরি বিধি-২০০৮( সংশোধিত-২০০৯) সংশোধনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় এবং সমবায় অধিদপ্তরকে পাস কাটিয়ে এককভাবে লোক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া প্রশাসনিক কাঠামো পাশ কাটিয়ে ‘চিফ অপারেটিং অফিসার (COO)’ বা ‘চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (CEO)’ নামে সমান্তরাল পদ সৃষ্টি করে ফাইল গায়েব ও আর্থিক অনিয়মের পথ সুগম করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের তীর রয়েছে সাবেক ছাত্রলীগের নেতা বর্তমান মিল্কভিটার ভারপ্রাপ্ত এমডি জাহিদুল ইসলামের দিকে। ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অনৈতিক লিয়াজোঁর মাধ্যমে তিনি এই পদে বসেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিম্নমানের ভেজাল দুধ সংগ্রহ, টেন্ডার কমিশন বাণিজ্য এবং কমিশন না দিলে ঠিকাদারদের বিল আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। গত ২০২৪-২০২৫ সালে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ও বরখাস্ত হওয়া কর্মচারীদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বরখাস্ত প্রত্যাহার ও সুবিধাজনক থানে স্থানে পুনর্বাসনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। এছাড়া ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মকর্তার কাছ থেকে পদোন্নতির নামে ২ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে এবং এমসি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য ও সমবায় অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কর্মকর্তাদের ২০% বেতন বৃদ্ধি করে তাদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যার কারণে প্রতিমাসে মিল্কভিটার প্রায় ৫০ লাখ টাকার স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে ।
চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত এমডির এই অপতৎপরতায় সহযোগিতা করছেন প্রশাসনের ১১ সদস্যের একটি আওয়ামী শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এদের মধ্যে রয়েছেন— মুহাম্মদ গালীব খান, উপ নিবন্ধক ( বিসিএস-সমবায়) ও অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক সমিতি, ড. রেজাউল করিম (উপ-মহাব্যবস্থাপক, প্রশাসন), মির্জা আবুল কালাম আজাদ (উপ-মহাব্যবস্থাপ, ডিডিপি), জনাব মো: মকবুল হোসেন (উপ-ব্যবস্থাপক, প্রশাসন), জনাব আব্দুল ওয়াহিদ (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় গুদাম), ড. মোঃ নভেল আক্তার (ব্যবস্থাপক, সমিতি), এস.এম খোশবুল আলম (ইনচার্জ, বিপণন, মিরপুর), জনাব মোঃ সালাহ্ উদ্দিন (পিএ টু চেয়ারম্যান), জনাব শাহরিয়ার হোসেন (পিএ টু এমডি), জনাব কামাল হোসেন (গাড়ি চালক, চেয়ারম্যান) এবং জনাব মোঃ ইয়াছিন আলী (অফিস সহকারী এমডি)। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই চক্র বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ, ভেজাল দুধ সংগ্রহ এবং অনৈতিক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সহ প্রতিষ্ঠানের সকল ধরনের অন্যায় অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে এরা সরাসরি জড়িত।
চেয়ারম্যান ও এমডির অবৈধ আদেশের প্রতিবাদ করায় নির্বাচিত শ্রমিক নেতাদের বদলি ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রায় দুই থেকে তিনশত শ্রমিক-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার পাঁয়তারা ও হুমকি দেওয়ার সত্যতা পাওয়া গিয়েছে। মিল্কভিটা ৪ঠা ডিসেম্বর ২০২৫ নির্বাচনে নির্বাচিত সিবিএর নেতারা ইতিমধ্যে এসব অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে মিছিল ও মিটিং করেছেন এবং অবৈধ বদলির আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৮৭ ধারা অনুযায়ী শ্রম আদালতে মামলাও দায়ের করেছেন অনেকে।
মিল্কভিটার এই অরাজক পরিস্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ধসের কারণে দুধ কালেকশন ও দুগ্ধ জাত পণ্য উৎপাদন বিপণন চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এরধারাবাহিকতায় সর্বস্তরের সাধারণ সদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দুগ্ধ খামারি ও স্টেকহোল্ডারদের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। সমবায় অধিদপ্তর ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর দাখিলকৃত আবেদনে তাঁরা ৪টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন:
১. উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন: উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগসমূহ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত প্রতিবেদন প্রকাশ।
২. চেয়ারম্যানের সদস্যপদে নিষেধাজ্ঞা: বর্তমান চেয়ারম্যান যাতে সমবায় আইন লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে কেন্দ্রীয় সমিতির সদস্যপদ গ্রহণ করতে না পারেন এবং ইজিএম-এর নামে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন, সে বিষয়ে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা জারি।
৩. সাময়িক বরখাস্ত ও কারণ দর্শানো নোটিশ: তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত রাখার স্বার্থে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কেন তাঁদের পদ থেকে অপসারণ বা সাময়িক বরখাস্ত করা হবে না, তা জানতে চেয়ে দ্রুত “কারণ দর্শানোর নোটিশ” জারি।
৪. নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ: সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চলমান মানসিক ও প্রশাসনিক নির্যাতন বন্ধ করে কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আবেদনপত্রে মিল্কভিটার সর্বস্তরের সাধারণ সদস্য, দুগ্ধ খামারি, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্টেকহোল্ডারদের পক্ষে মফিজ সিকদার, নজরুল হাওলাদার, করিম মাতাব্বর এবং নারায়ণ ঘোষসহ বহু সদস্য সরাসরি স্বাক্ষর করে। বর্তমান চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে আওয়ামী সিন্ডিকেটদের নিয়ে পদে টিকে থাকলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-শ্রমিক কর্মচারী এবং সমবায়ী সদস্যগণ। সরকারের প্রায় ৭৫ পার্সেন্ট শেয়ারকৃত এই বৃহৎ জাতীয় সমবায় প্রতিষ্ঠান এবং লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের আস্থা বিশ্বাস ও প্রান্তিক দুগ্ধ খামারি এবং অগণিত খেটে খাওয়া মানুষের কর্মসংস্থানের জায়গা (মিল্কভিটাকে) রক্ষার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট সকলের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সকল শ্রমিক-কর্মচারী, শ্রমিক প্রতিনিধি, প্রান্তিক দুগ্ধ খামারি ও সমবায়িরা।
এ বিষয়ে বারবার অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান শাতিল সাহেব এবং ভারপ্রাপ্ত এমডিসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।



