ঋণ খেলাপির রায়ে থামল আসলাম চৌধুরীর সংসদ যাত্রা, ফল প্রকাশেও নিষেধাজ্ঞা

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের বেসরকারিভাবে বিজয়ী বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ঋণ খেলাপির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে মঙ্গলবার (৩০ জুন) দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ রায় দিয়ে বলেছেন, আসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারবেন না। একই সঙ্গে তার নির্বাচনের ফলাফলও প্রকাশ করা যাবে না। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে গত ১৫ জুন দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য ৩০ জুন দিন নির্ধারণ করেছিলেন।
এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটলেও রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী মহল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। কারণ, ক্ষমতাসীন বিএনপির একজন প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেতা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও আদালতের রায়ে সংসদে যেতে পারছেন না, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আদালতে আসলাম চৌধুরীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী। তাদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মো. ফারুক। রাষ্ট্রের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। ব্যাংক এশিয়া পিএলসির পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম।
মামলার সূত্রে জানা যায়, গত ৩ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন। এরপর ঋণ খেলাপির অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। শুনানি শেষে ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন ওই আপিল খারিজ করে দিলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে। পরে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক রিট আবেদন করা হয়। ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট শুনানি শেষে দুটি রিটই খারিজ করে দেন। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হাইকোর্টের আদেশে আসলাম চৌধুরী প্রার্থিতা ফিরে পান।
পরবর্তীতে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আদেশ দেন, যদি আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে জয়ী হন, তাহলে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আসনের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন। তবে আদালতের নির্দেশনার কারণে তার ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়।
লিভ টু আপিল মঞ্জুর হওয়ার পর গত ৩১ মার্চ পৃথক আপিল আবেদন করা হয়। পরে ২৮ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালত বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। কয়েক দফা কার্যতালিকায় ওঠার পর গত ৯ জুন শুনানি শুরু হয়। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় আপিল বিভাগ দুইজন অ্যামিকাস কিউরি (আদালত বন্ধু), জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগীকে মতামত দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেন। গত ১৫ জুন দ্বিতীয় দিনের শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য ৩০ জুন দিন ধার্য করেন। অবশেষে মঙ্গলবার ঘোষিত রায়ে আদালত বলেন, ঋণ খেলাপির কারণে আসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারবেন না এবং তার নির্বাচনের ফলাফলও প্রকাশ করা যাবে না।
রায় ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। আসলাম চৌধুরীর সমর্থকদের অনেকেই লিখেছেন, “ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে আজকের এই ঘটনাটি। বিএনপি ক্ষমতায়। এরপরও বিএনপির হেভিওয়েট, বিপুল ভোটে জয়ী জনপ্রিয় নেতা আসলাম চৌধুরীর শপথ বাতিল। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। বিএনপির গতিতে আইন চললে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও ফটিকছড়ি আসনের জয়ী প্রার্থীর শপথ বাতিল কখনোই হতো না। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের মর্ম রাখতে পেরেছে বিএনপি সরকার। তবে চরম সত্য হলেও কষ্ট লাগছে আসলাম চৌধুরীর মতো একজন ব্যক্তির এই অবস্থা দেখে। আওয়ামী লীগ সরকার আসলাম চৌধুরীকে বিনা কারণে ও মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ আট থেকে দশ বছর কারাগারে রেখেছিল। যার ফলে তার ব্যবসা-বাণিজ্যে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। আশা করি, তিনি ভিন্ন কোনো মাধ্যমে আবারও ফিরে আসবেন।”
অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মন্তব্যের ঘরে ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। অনেকেই “আলহামদুলিল্লাহ” লিখে আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার অনেকেই মন্তব্য করেছেন, ঋণ খেলাপির কারণে আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হোক। অপরদিকে কেউ কেউ লিখেছেন, আসলাম চৌধুরী ব্যক্তি হিসেবে ভালো নন এবং অতীতে তাকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও সন্ত্রাসে মদদের অভিযোগ ছিল। তবে এগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির মতামত; আদালতের রায়ে এসব বিষয়ে কোনো পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী নেতার ক্ষেত্রেও আদালতের এমন সিদ্ধান্ত দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এই রায় ভবিষ্যতে ঋণ খেলাপি প্রার্থীদের নির্বাচন ও প্রার্থিতা সংক্রান্ত আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে। সব মিলিয়ে আপিল বিভাগের এই রায় চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচন ছাড়িয়ে দেশের রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।



