অপরাধ

সাবেক ডিএমপির ডিসি আলমগীর হোসেনের গা শিউরে ওটা আমলনামা ফাঁস

বিশেষ প্রতিনিধি: পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেনকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ ও তার চাকরিজীবনসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানো, এক ব্যবসায়ীকে গুমের চেষ্টার অভিযোগ, থানার ভেতরে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ এবং হেফাজতে নির্যাতনের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ওঠে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারি তদন্তে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের (Dismissal from Service) সুপারিশ করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সুপারিশ কার্যকর হয়নি এবং তিনি চাকরিতে বহাল থাকেন।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে আলমগীর হোসেন বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন। এতে বলা হয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ সমর্থনে তাকে পুনর্বহাল করা হয়। একই সঙ্গে পরপর দুটি পদোন্নতি দিয়ে ডিএমপির গুরুত্বপূর্ণ ডিসি (ক্রাইম) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে তিনি রংপুর রেঞ্জের পুলিশ সুপার (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ফিন্যান্স) পদেও দায়িত্ব লাভ করেন।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল
সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিব

অনুসন্ধান এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া নথির সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে মৌলভীবাজারে কর্মরত থাকাকালে তৎকালীন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ডা. রাজিয়া সুলতানা, জে পি এল ডোর অ্যান্ড ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ ও জালালাবাদ প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম সজীবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ, বাকিতে মূল্যবান ফার্নিচার ও একটি গাড়ি সংগ্রহের প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ী সজীবের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে সজীব পাওনা অর্থ ফেরত চাইলে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৭ আগস্ট ঢাকার বাসা থেকে মো. সাইফুল ইসলাম সজীবকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা ও উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের হস্তক্ষেপের পর তাকে মৌলভীবাজার মডেল থানায় নেওয়া হয়। একই নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে অল্প সময়ের ব্যবধানে সজীবের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়, যা ভুক্তভোগীর দাবি অনুযায়ী সম্পূর্ণ সাজানো ও ভিত্তিহীন ছিল।

বান্ধবী রাজিয়া সুলতানা ও আলমগীর

এই ঘটনার পেছনে তৎকালীন সরকারের চিফ হুইপ ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এবং তার ছোট ভাই মোসাদ্দেক হোসেন মানিকের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। একই সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আলমগীর হোসেন তার খালাতো ভাই সোহেল রানা, ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ডা. রাজিয়া সুলতানা এবং তার বডিগার্ড নাজিম উদ্দিনকে বাদী করে ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করান। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব মামলা ছিল পরিকল্পিত ও ভিত্তিহীন।

মামলাগুলোর পর সজীবকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং সেখানে তিনি দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে এবং শত শত শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আব্দুস শহীদ ও মানিক

ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম সজীব ২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে পুলিশের দীর্ঘ তদন্ত পরিচালিত হয়। অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট নথির সূত্রে দাবি করা হয়েছে, তদন্তে আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার আওতায় আলমগীর হোসেনকে ‘চাকরি হতে বরখাস্ত’ (Dismissal from Service) করার শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চূড়ান্ত মতামত চায়। পরবর্তীতে একই বছরের ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) তাকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্তের পক্ষে মতামত প্রদান করে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে আরও একাধিক গুরুতর অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে অনুসন্ধানী নথিতে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সার্কেলে কর্মরত থাকাকালে থানার ভেতরে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ওঠে। একই অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাটি গোপন রাখতে ওই নারীর স্বামী লিটন হাসান ইমনকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া হেফাজতে নির্যাতন, জিজ্ঞাসাবাদের নামে অমানবিক আচরণ এবং আটক ব্যক্তিদের গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগপত্র ও অনুসন্ধানী নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

লিটন হাসান ইমন (অন্ধ)

বিভাগীয় তদন্ত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ এবং বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মতামতে চাকরি থেকে বরখাস্তের সুপারিশ হওয়ার পরও পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন (বিপি নং-৭৯০৬১১১১৪৩) বর্তমানে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে পুলিশ সুপার (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ফিন্যান্স) পদে কর্মরত রয়েছেন। একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায়ও তার বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগের উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভাগীয় তদন্তে উত্থাপিত অভিযোগের পরও কীভাবে তিনি পুনর্বহাল ও পদোন্নতি লাভ করে পুলিশের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এবং আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আলমগীর হোসেনসহ অভিযোগে নাম আসা অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের আওতায় এনে বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

কামাল (অন্ধ)
কুতুব উদ্দিন (অন্ধ)

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে অভিযোগগুলোর তদন্তকারী কর্মকর্তা, সিলেট রেঞ্জের তৎকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি নাসির উদ্দিন আহমেদ ‘অপরাধ বিচিত্রা’-কে বলেন—

“এই অতি গুরুতর অভিযোগের তদন্তভার আমার ওপর অর্পণ করা হয়েছিল। আমি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণসহ চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরের শৃঙ্খলা শাখায় জমা দিয়েছি।”

অভিযোগগুলোর বিষয়ে পুলিশের বর্তমান অবস্থান জানতে এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস)-এর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযোগ এবং অনুসন্ধানে উঠে আসা আরও তথ্য ও অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button