
মুহাম্মাদ জুবাইর
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ধারাবাহিক গোয়েন্দা ও আভিযানিক অভিযানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। পৃথক তিনটি বিশেষ অভিযানে আলোচিত হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার মোট পাঁচজন এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১১ রাউন্ড গুলি, তিন রাউন্ড কার্তুজ, একটি এলজি এবং একটি বড় ছোরা। এর মধ্যে এলজি ও ছোরাটি একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। জেলা পুলিশের দাবি, এসব অভিযান সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং পলাতক অপরাধীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে নতুন গতি সৃষ্টি করবে।
জেলা পুলিশ জানায়, চট্টগ্রামের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নির্মূলে জেলা পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। আধুনিক প্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল ফোনের তথ্য, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে পরিচালিত এসব অভিযানে একের পর এক দুর্ধর্ষ অপরাধীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, কোনো অপরাধী যতই প্রভাবশালী বা কৌশলী হোক না কেন, আইনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রথম অভিযানে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ গত ১৩ জুন চট্টগ্রাম মহানগরের পাহাড়তলী এলাকায় সংঘটিত বহুল আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে। ঘটনার পর থেকেই ডিবি পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নিবিড় তদন্ত শুরু করে। তদন্তে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের অবস্থান ও পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ২ আগস্ট রাতে সীতাকুণ্ড থানার শীতলপুর এলাকায় শাহ আমিন উল্লাহ ফিলিং স্টেশনের সামনে বিশেষ চেকপোস্টে অভিযান চালিয়ে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো. দিদার আলম (৩০) ও মো. আফসার মিয়া (৩০)-কে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের পর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তারা অবৈধ অস্ত্র গোপন করে রাখার বিষয়টি স্বীকার করে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩ আগস্ট দিবাগত রাত প্রায় আড়াইটার দিকে রাউজান উপজেলার পূর্ব রাউজান (জুরুলকুল) এলাকায় আমির হোসেন ফকির বাড়ির পেছনে সেফটি ট্যাংক সংলগ্ন মাটির নিচে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে সাদা প্লাস্টিকের বস্তার ভেতরে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং দুই রাউন্ড ৭.৬৫ ক্যালিবার গুলি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, দিদার আলম দীর্ঘদিন ধরে হত্যা, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ মোট ১০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অপরদিকে আফসার মিয়ার বিরুদ্ধে একই ধরনের ছয়টি মামলা রয়েছে। এছাড়া রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও আশপাশের এলাকায় সংঘটিত একাধিক চাঞ্চল্যকর অপরাধের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয় অভিযানে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ একটি হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে দুই আসামিকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং নয় রাউন্ড তাজা গুলি। পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটি অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা পাওয়া গেছে। অস্ত্রটির উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তৃতীয় অভিযানে হাটহাজারী মডেল থানা পুলিশ বহুল আলোচিত নুরুল আজিম হত্যা মামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও এক নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি মো. দিদারুল আলম (৪৭)-কে দীর্ঘদিনের চেষ্টার পর ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গত ১০ জুলাই হাটহাজারী উপজেলার মেখল ইউনিয়নের পশ্চিম মেখল এলাকায় জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নুরুল আজিমকে প্রথমে গুলি করে এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার পরপরই পুলিশের অভিযানে দুই আসামি গ্রেফতার হলেও মূল পরিকল্পনাকারী দিদারুল আলম পালিয়ে যায়।

পুলিশ জানায়, গ্রেফতার এড়াতে সে চট্টগ্রামের বাকলিয়া, রাউজান, খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি, সিলেটের গোয়াইনঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে। পরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবস্থান নেওয়ার তথ্য পেয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিপিএম-এর সার্বিক নির্দেশনায় হাটহাজারী মডেল থানার একটি বিশেষ দল সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দিদারুল আলম জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নিজ বাড়ি সংলগ্ন গোয়ালঘরে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি এলজি এবং একটি বড় ছোরা উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, উদ্ধার হওয়া অস্ত্র দুটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ছয়টি সাজা ও একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকরের অপেক্ষায় ছিল। সহযোগী মোরশেদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা এবং এক বছরের সাজা পরোয়ানাও বিচারাধীন রয়েছে। অন্যদিকে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার দিদার আলম ও আফসার মিয়ার বিরুদ্ধেও হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক মামলা রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মাদক, পরিকল্পিত হত্যা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। অপরাধীদের অবস্থান দেশের যেখানেই হোক না কেন, গোয়েন্দা তথ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, সিসিটিভি বিশ্লেষণ এবং পেশাদার আভিযানিক কৌশলের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও আরও জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।



