অনুসন্ধানঅপরাধঅভিযানদুর্নীতিপ্রতারনা

সাভারের নতুন ওসি সাইফুল আলমকে নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা

ঢাকা জেলার সাভার মডেল থানার নতুন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল আলমের পদায়নকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার অতীত কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে।

সরেজমিনে তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল আলম ২০১৭ সালে পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৮ সালের নির্বাচনে শরিয়তপুর জেলা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ফরিদপুর জেলায় বিভিন্ন থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তিনি বিএনপি- জামাত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার বাদী হয়েছেন। বিএনপি- জামাত নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।

২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় শরিয়তপুর জেলা গোয়েন্দা সংস্থার ওসি হিসাবে দায়িত্বে থাকার পর ২০২১ সালের শেষের দিকে মেহেরপুর জেলায় বদলি হন। পরবর্তীক্রমে মেহেরপুর সদর থানায় ওসি (তদন্ত) এবং ২০২২ সালে মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-এর ওসি হিসেবে যোগদান করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি- জামাত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ডিবির ওসি সাইফুল আলম ছিলেন জেলাজুড়ে ভয়ংকর আতঙ্ক। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের স্ত্রী মোনালিছার নির্দেশে জুলাই আন্দোলনে বিএনপি-জামাত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, হয়রানি ও গ্রেপ্তার বাণিজ্যের নায়ক ছিলেন সাইফুল আলম। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট মুজিবনগর থানায় ওসি হিসেবে বদলি হলে কয়েকদিনের মাথায় জনতার রোষানলে পরে থানা থেকে পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
জানাগেছে, ২০২৫ সালে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী থানার ওসি এবং সর্বশেষ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি, ৩০ জুলাই তাকে সাভার মডেল থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা আক্তার।

এ বিষয়ে মেহেরপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হুসাইন জানান, মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি সাইফুল আলম ছিলেন ভয়ংকর একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তার দাপটে আতঙ্কে থাকতো সাধারণ মানুষ। আমার দলের শতাধিক নেতাকর্মীদের বিভিন্ন গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার করেন এবং জুলাই আন্দোলনের সময় মুজিবনগর জামায়াতের সভাপতি খাইরুল বাশার, রবিউল ডাক্তার, শামীম রেজা, হাসান ও সোহেল ডলারসহ ৯ জনকে বাড়ি থেকে তুলে এনে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে হয়রানি করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটে। মো. ইকবাল হুসাইন বলেন, “যার বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে, তাকে কিভাবে সাভার মডেল থানার মত গুরুত্বপূর্ণ থানায় ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়।

মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান জানান, ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সাইফুল আলমের নেতৃত্বে জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিএনপির নেতাকর্মী ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার ও অভিযানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেন।
এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে, যা বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই সময়ে সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের স্ত্রী মোনালিসা ইসলামকে কেন্দ্র করে পরিচালিত একটি অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্কের কার্যক্রম চলত। সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হতো এবং তৎকালীন ডিবির ওসি সাইফুল আলম এ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন। মেহেরপুর জেলা জুড়ে সকল সেক্টর থেকে টাকা তুলতেন। তাই নেতাকর্মীরা সাইফুল আলমকে সাবেক মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের স্ত্রী মোনালিছার ক্যাশিয়ার হিসাবে জানতেন। সবসময় তার বাসা এবং নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবেন। একজন মন্ত্রী নিজ জেলায় আসলে বেশি সময় থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কে দেখা যায়। কিন্তু সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের বেলায় ছিল ভিন্ন চিত্র। বেশি সময় ডিবির ওসি সাইফুল আলমকে দেখা যেত।
মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মুজিবনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাবেক ওসি সাইফুল আলম সাবেক মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন এবং অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে শতকোটি টাকা কামিয়েছেন।
এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাকে সাভার মডেল থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হলো? এটি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের জানানো হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button