প্রশাসন

ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল পুলিশ কনস্টেবলের

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম নগরীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে তিন যুবককে ধাওয়া করার সময় বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত পুলিশ কনস্টেবল আল আমিন সরদার (২৫) মারা গেছেন। সোমবার ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ অর্ডার ম্যানেজমেন্ট শাখার কনস্টেবল আল আমিন সরদার কোতোয়ালী থানায় সংযুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২২ সালে তিনি বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় তার অকাল মৃত্যুতে সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবির জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় আল আমিনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সোমবার সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

ওসি জাহেদুল কবির বলেন, আল আমিনের মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন হয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াসা মোড়ে একটি চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন কনস্টেবল আল আমিনসহ পুলিশের কয়েকজন সদস্য। এ সময় তিন যুবককে সন্দেহজনকভাবে চলাফেরা করতে দেখে তাদের থামার সংকেত দেওয়া হয়।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন যুবকের মধ্যে একজন পুলিশের সংকেত অমান্য করে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন চেকপোস্টের ইনচার্জ এএসআই হিরণ মিয়া ওই যুবকের পিছু নেন।

পুলিশ জানায়, পালিয়ে যাওয়া যুবককে আটক করতে পুলিশের সদস্যরা বিভিন্ন দিক থেকে তাকে ঘিরে ধরার চেষ্টা করেন। এ সময় আল আমিনও মোটরসাইকেল নিয়ে অন্য একটি পথ ধরে সামনে এগিয়ে অবস্থান নেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এএসআই হিরণ মিয়া মসজিদের উত্তর ফটকের দিকে এগিয়ে যান। অন্যদিকে কনস্টেবল আল আমিন মোটরসাইকেলে করে মসজিদের পশ্চিম ফটকের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

পুলিশের দাবি, এ সময় লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি বাস দ্রুতগতিতে এসে পেছন থেকে আল আমিনকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার পর তিনি বাসের নিচে পড়ে যান এবং বাসটি তাকে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত ছেঁচড়ে নিয়ে যায়।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় লোকজন দ্রুত এগিয়ে আসেন। গুরুতর আহত অবস্থায় আল আমিনকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তার অবস্থা গুরুতর বিবেচনায় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় বাসটির চালককে আটক করেন। একই সঙ্গে বাসটি জব্দ করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় বাসচালক মোশাররফ (৩৮) এবং বাসের স্টাফ জয় দাসকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করা হয়েছে।

পুলিশ দুর্ঘটনার কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত বিষয় তদন্ত করে দেখছে। একই সঙ্গে ঘটনার সময় বাসটির গতি, চালকের দায়িত্বশীলতা এবং দুর্ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নিহত কনস্টেবল আল আমিন সরদার ২০২২ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। চাকরিজীবনের শুরু থেকেই তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। বর্তমানে তিনি সিএমপির পুলিশ অর্ডার ম্যানেজমেন্ট শাখায় কর্মরত ছিলেন এবং কোতোয়ালী থানায় সংযুক্ত ছিলেন।

দায়িত্ব পালনকালে একজন পুলিশ সদস্যের এমন মৃত্যুতে সহকর্মীদের মধ্যে শোকের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হাবিবুর রহমান প্রামাণিক বলেন, দায়িত্ব পালনকালে কনস্টেবল আল আমিনের মৃত্যু হয়েছে। আইন অনুযায়ী তার পরিবার আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবে।

তিনি বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আল আমিনের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারি বিধি অনুযায়ী তার পরিবারের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হবে।

এদিকে আল আমিনের মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক তিন যুবককে থামানোর মধ্য দিয়েই ঘটনার সূত্রপাত। তাদের একজন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে আটক করতে পুলিশের সদস্যরা পিছু নেন। সেই অভিযানের সময়ই আল আমিন মোটরসাইকেল নিয়ে সামনে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই দ্রুতগতির বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন তিনি। ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মাত্র ২৫ বছর বয়সে একজন পুলিশ সদস্যের এমন মৃত্যুতে তার সহকর্মী ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের আবহ। তার মৃত্যুতে পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য হারানোর পাশাপাশি পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button