চট্টগ্রাম

চসিক মেয়রের বাধায় নগর ভবন থেকে ফিরল পুলিশ, পালাল কিশোর গ্যাং লিডার বগা

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম নগর ভবনে স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালিয়েছে খুলশী থানা-পুলিশ। তবে অভিযান চলাকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে পুলিশের বাগ্‌বিতণ্ডা এবং তাঁর হস্তক্ষেপের পর পুলিশ অভিযান শেষ না করেই ফিরে এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় নগর ভবন থেকে কিশোর গ্যাং লিডার বগা পালিয়ে যান বলেও দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নগর ভবনে এ ঘটনা ঘটে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ বা মেয়র কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। খুলশী থানা-পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, ওয়াকিল হোসেন বগা ওই রাতে নগর ভবনে অবস্থান করছেন-এমন গোপন তথ্য পায় খুলশী থানা-পুলিশ। খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত নগর ভবনে গিয়ে প্রথমে ভবনটি ঘিরে ফেলে। পরে বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একটি দল নগর ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে।

এ সময় মেয়র শাহাদাত হোসেন পুলিশকে বাধা দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মেয়রের বাগ্‌বিতণ্ডাও হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরিস্থিতির একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার ফয়সাল আহমেদ।

পুলিশ সূত্রের অভিযোগ, মেয়রের হস্তক্ষেপের পর অভিযান আর এগিয়ে নেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে পুলিশ নগর ভবন থেকে ফিরে আসে। এর মধ্যেই ওয়াকিল হোসেন বগা নগর ভবন থেকে বের হয়ে পালিয়ে যান বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।তবে ঠিক কী কারণে পুলিশ অভিযান বন্ধ করে ফিরে এসেছে এবং মেয়রের সঙ্গে পুলিশের কী নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন-কোনো পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াকিল হোসেন বগা চট্টগ্রাম নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। চলতি বছরের জুনে একটি সরকারি জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে বগার বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর গত ৮ জুন তাঁকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এরপর গত মাসে পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে তুলে নিয়ে মারধরের ঘটনায় করা মামলায় বগাকে প্রধান আসামি করা হয়। ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য খুলশী এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশি অভিযানের সময় বগার অনুসারীরা সড়ক অবরোধ করে এবং পুলিশের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।

পুলিশের ওপর ওই হামলার ঘটনায় করা মামলাতেও ওয়াকিল হোসেন বগাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে, বগার বিরুদ্ধে এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় হৃদয় নামের এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।ওই হত্যাকাণ্ডের পর অভিযান চালিয়ে আট কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে পুলিশ জানায়, দুই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধের জের ধরে হৃদয়কে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত হৃদয় ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া আটজন ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য। পুলিশ আরও দাবি করেছে, ওয়াকিল হোসেন বগা ও রকিবুল ইসলাম ওরফে পিচ্চি ‘সেভেন স্টার’ গ্যাং পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বিজয়, কামরান ও শান্তর নেতৃত্বে ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাং পরিচালিত হয় বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশ বলছে, কিশোর গ্যাংকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে খুলশী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এর জেরে সংঘর্ষ, হামলা ও ছুরিকাঘাতের মতো ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া মঙ্গলবার খুলশীতে চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলায় জালালাবাদ সি বিচ এলাকায় বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান চালায় খুলশী থানা-পুলিশ। ওই অভিযানে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—ফাতেমা আক্তার প্রকাশ বালি (৪৫), বাবলু প্রকাশ বাবু (৪৭) ও মো. আবু তাহের প্রকাশ কালু (৩০)। খুলশী থানা-পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার তিনজনই কিশোর গ্যাং লিডার ওয়াকিল হোসেন বগার সহযোগী।পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াকিল হোসেন বগা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। চাঁদাবাজি, মাদক, বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১৭টি মামলা রয়েছে।

এমন অবস্থায় একাধিক মামলার আসামি ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত বগাকে গ্রেপ্তারে নগর ভবনে পুলিশের অভিযান এবং পরে অভিযান বন্ধ করে ফিরে আসার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পুলিশের অভিযানের সময় মেয়রের সঙ্গে পুলিশের বাগ্‌বিতণ্ডা এবং তাঁর হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় এনেছে।তবে পুরো ঘটনার বিষয়ে মেয়র শাহাদাত হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে পুলিশের পক্ষ থেকেও অভিযান বন্ধের কারণ বা নগর ভবন থেকে বগার পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button