আইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে হিরোইনসহ ছাত্রদল নেতা ইপু গ্রেফতার পলাতক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বেলাল

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ এলাকায় ঢাকা থেকে আসা একটি বাসে অভিযান চালিয়ে ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের দাবি করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় শাহেদুল ইসলাম আনান ও মো. ইপু সুলতান অপি নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় বেলাল আলী খান নামে আরও একজনকে পলাতক আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ইপু সুলতান অপি আকবর শাহ থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের পর ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে তাঁকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠনের সব পদ থেকে বহিষ্কার করেছে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদল।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাঁরা ঢাকা থেকে কম দামে হেরোইন সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে আসছিলেন। পুলিশ আরও দাবি করেছে, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় আসামির সঙ্গে যোগসাজশে ঢাকা থেকে হেরোইন এনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে আসছিলেন।যেভাবে পরিচালিত হয় অভিযানপুলিশের এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৫ অক্টোবর রাত সোয়া ১০টার দিকে এ-সংক্রান্ত অভিযান ও ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত হয়। এর আগে সন্ধ্যায় আকবর শাহ থানাধীন সিটি গেট এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের সদস্যরা জানতে পারেন, ঢাকাগামী একটি বাসে একজন যাত্রী হেরোইন নিয়ে চট্টগ্রামে আসছেন।এজাহার অনুযায়ী, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের একটি দল সেদিন সকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে গোয়েন্দা সদস্যরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিএসআরএম কারখানা এলাকায় অবস্থান নেন।রাত আনুমানিক ৮টা ৫০ মিনিটে ‘সেঁজুতি ট্রাভেলস’ নামের বাসটি সেখানে পৌঁছালে পুলিশ সেটি থামায়। সন্দেহভাজন এক যাত্রীর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে তাঁকে কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, ঢাকার টিটিপাড়া এলাকা থেকে ‘রনি’ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে হেরোইন কিনে এনেছেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অন্য একজনের কাছে মাদক জমা রাখার ব্যবস্থা করেন।কর্নেলহাটে দ্বিতীয় আসামি গ্রেপ্তারপুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে বাসটি ডি টি রোডের কর্নেলহাট উত্তর কাট্টলী এলাকার ফুটওভার ব্রিজের কাছে পৌঁছালে দ্বিতীয় ব্যক্তি সেখানে আসেন। প্রথম আসামি তাঁকে শনাক্ত করলে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে আটক করে।গ্রেপ্তার দুজন হলেন শাহেদুল ইসলাম আনান ও মো. ইপু সুলতান অপি। অপরদিকে, বেলাল আলী খানকে মামলায় পলাতক আসামি করা হয়েছে।জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, তৃতীয় আসামি খুলশী থানাধীন আমবাগান এলাকার শাহাজাহান মাঠের আশপাশে অবস্থান করছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালানো হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।১০০ গ্রাম হেরোইন ও দুটি মুঠোফোন জব্দপরে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে শাহেদুল ইসলাম আনানের পরিহিত সাদা কার্গো প্যান্টের ডান পকেট থেকে একটি লাল শপিং ব্যাগ উদ্ধার করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। ব্যাগের ভেতরে নীল পলিথিনে মোড়ানো সাদা প্লাস্টিকের একটি প্যাকেটে হেরোইন পাওয়া যায়। ডিজিটাল নিক্তিতে পলিথিনসহ মাদকের ওজন ১০০ গ্রাম পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।এ সময় বাসের টিকিট ও দুটি মুঠোফোনও জব্দ করা হয়। জব্দ করা মাদকদ্রব্য, অন্যান্য আলামত এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।পরদিন ৬ অক্টোবর রাত ১টা ১০ মিনিটে খুলশী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) ধারার সারণির ৮(গ) ও ৪১ ধারায় মামলা করা হয়। তদন্তে মাদকের উৎস, পরিবহনপথ এবং সম্ভাব্য ক্রেতা-বিক্রেতাদের বিষয়ে খতিয়ে দেখা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কারমাদক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইপু সুলতান অপিকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, চট্টগ্রাম মহানগর। সংগঠনটির ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আকবর শাহ থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইপু সুলতান অপিকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠনের সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল আলম ও সদস্যসচিব শরিফুল ইসলাম তুহিন এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষরকারী হিসেবে আল মামুন সাদ্দামের নাম উল্লেখ রয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং দপ্তরের চলতি দায়িত্বে রয়েছেন।মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের পরপরই বহিষ্কারের এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বেলাল আলী খানকে ঘিরে আলোচনাএ মামলার অপর আসামি বেলাল আলী খান আকবর শাহ থানাধীন ১০ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক বলে স্থানীয় পর্যায়ে দাবি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন এবং প্রশাসন তাঁকে খুঁজছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে।স্থানীয় পর্যায়ে বেলাল আলী খানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে পাহাড়তলী বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করেন।এ ছাড়া মাদক মামলার আসামিদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা চলছে। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়, অপরাধচক্রের বিস্তৃতি ।পাহাড়তলী-আকবর শাহে মাদক কারবার নিয়ে উদ্বেগপাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় মাদক কারবার বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের অভিযোগ, এসব এলাকায় মাদক ব্যবসার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। এ অভিযোগের বিষয়ে অধিদপ্তরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, যাঁরা মাদক ব্যবসায় জড়িত, তাঁরা কখনোই বিএনপির অঙ্গসংগঠনের প্রকৃত নেতা-কর্মী হতে পারেন না। তাঁদের ভাষ্য, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে মাদক কারবারি হিসেবেই চিহ্নিত করা উচিত।নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির আরেক তৃণমূল নেতা প্রশ্ন তোলেন, মাদক নিয়ে গ্রেপ্তারের পর কেন ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কার করা হলো? এর আগে দলীয় কর্তৃপক্ষ জানতেন না কে কী করেন, নাকি মাদকের টাকায় সিনিয়র নেতারা চলেন-এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় মাদক কারবারের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।তদন্তের দিকে নজর১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের এ ঘটনায় দুই ব্যক্তির গ্রেপ্তার, একজনের পলাতক থাকা এবং ছাত্রদল নেতার বহিষ্কারকে ঘিরে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে পলাতক আসামি বেলাল আলী খানকে গ্রেপ্তার, মাদকের উৎস শনাক্ত এবং সরবরাহকারী ও ক্রেতাদের খুঁজে বের করার বিষয়টি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button