অপরাধ

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ডিএফও ড. নাসের মোহসিনের যোগসাজশে চেক স্টেশনগুলোতে টিপি চেকের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ

এম শাহীন আলম: চট্টগ্রাম (উত্তর) বন বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন চেক স্টেশনে বনজ পণ্যবাহী যানবাহনের ট্রানজিট পাস (টিপি) ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। মিরসরাইয়ের করেরহাট রেঞ্জের করেরহাট ও ধুমঘাট চেক স্টেশন, কুমিরা রেঞ্জের ফৌজদারহাট চেক স্টেশন এবং হাটহাজারী রেঞ্জের হাটহাজারী চেক স্টেশনকে ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। কাঠ ব্যবসায়ী, পরিবহনচালক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, গাড়ির ধরন ও বহন করা পণ্যের পরিমাণভেদে সর্বনিন্ম দুই হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দিতে হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গাড়ি আটকে রাখা, মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো এবং নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের।

এসব অভিযোগের তীর খোদ চট্টগ্রাম (উত্তর) বন বিভাগের উপবন সংরক্ষক ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেনের দিকে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকির অভাবেই চেক স্টেশনগুলোতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবী ডিএফও যদি ঠিক থাকেন তিনি যদি নির্দেশই না দিয়ে থাকেন তাহলে স্টেশনে কর্তব্যরতরা কি করে প্রকাশ্যে কাগজপত্র টিপি চেকের নামে চাঁদাবাজি করে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা এবং কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য বনজ পণ্য নিয়ে বিভিন্ন যানবাহন চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করে। এসব পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বৈধ কাগজপত্র, ট্রানজিট পাস (টিপি) এবং সংশ্লিষ্ট অনুমতিপত্র যাচাই করা বন বিভাগের দায়িত্বের অংশ।

কিন্তু এই দায়িত্ব পালনের আড়ালে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের প্রতিটি চেক স্টেশনে অনিয়ম করে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। অন্যথায় গাড়ি ছাড়তে বিলম্ব করা হয় কিংবা বিভিন্ন ধরনের আইনি জটিলতার ভয় দেখানো হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, বৈধ কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ার বাইরে এ ধরনের অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে তা সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের গুরুতর লঙ্ঘন।
ধুমঘাট, করেরহাট, ফৌজদারহাট ও হাটহাজারী এলাকার কয়েকজন কাঠ ব্যবসায়ী এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চেক স্টেশনগুলোতে কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তাঁরা ব্যবসার প্রয়োজনে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রযোজ্য কর, ভ্যাট ও অন্যান্য ফি পরিশোধ করেন। এরপরও চেক স্টেশনে টিপি যাচাইয়ের সময় অতিরিক্ত টাকা দিতে হলে তাঁদের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়।
তাঁদের ভাষ্য, গাড়ির ধরন, কাঠের পরিমাণ এবং পণ্যের প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গাড়িপ্রতি সর্বনিম্ন দুই হাজার টাকা দিতে হয় বলে তাঁরা দাবি করেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে গাড়ি আটকে রেখে সময়ক্ষেপণ করা হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তাঁদের প্রশ্ন, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও যদি অতিরিক্ত অর্থ না দিলে গাড়ি ছাড়তে সমস্যা হয়, তাহলে সরকারি নিয়মে নির্ধারিত সেবা ও যাচাইপ্রক্রিয়া বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে?

স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, চেক স্টেশনে গাড়ি পরীক্ষা করার কথা থাকলেও অনেক সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি গাড়ির কাছে গিয়ে পণ্য যাচাই করতে দেখা যায় না। তাঁদের দাবি, গাড়ির চালক, হেলপার কিংবা চালানদার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে স্টেশনে যান এবং যাচাই শেষে টিপি চেকের নামে ঘুষ দিয়ে সিল-স্বাক্ষরযুক্ত কাগজ নিয়ে ফিরে আসেন।
এসব কাগজপত্র চেকের নামে চাঁদাবাজির কারণে চেক স্টেশন গুলাতে গাড়ির প্রকৃত পণ্য, পরিমাণ, বৈধ উৎস, পরিবহন অনুমতি ও টিপির তথ্য যথাযথভাবে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, চট্টগ্রাম (উত্তর) বন বিভাগের আওতাধীন এসব চেক স্টেশনে অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কার্যালয়ে একাধিকবার আলোচনা করা হলেও দৃশ্যমান প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তাঁদের অভিযোগ, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন তাঁরা দেখতে পাননি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম (উত্তর) বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেনের কার্যালয়ে সরাসরি গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। দুই দিন তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠানো হয় প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে ডিএফওর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে পুনরায় প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

বনজ পণ্য পরিবহনে বৈধ কাগজপত্র যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অননুমোদিত অর্থ আদায় করলে তার দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যদিকে, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কোনো পরিবহনকারীকে হয়রানি কেন করা হচ্ছে , সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ অবস্থায় করেরহাট, ধুমঘাট, ফৌজদারহাট ও হাটহাজারী চেক স্টেশনের কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, টিপি যাচাইয়ের নথি পরীক্ষা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন পর্যালোচনা এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা।

চট্টগ্রাম (উত্তর) বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট চেক স্টেশনগুলোতে টিপি যাচাইয়ের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে অপরাধ বিচিত্রার অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে টিপি চেকের নামে ঘুষ চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক নিউজ চলমান থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button