ইসলাম ধর্মধর্ম ও জীবন

জীবনের কঠিন সময়ে আশার প্রদীপ: পবিত্র কুরআনের তাওয়াক্কুল ও রিযিকের বার্তা

ধর্ম ও জীবন ডেস্ক: মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন চারপাশের সমস্ত দরজা বন্ধ মনে হয়। শত চেষ্টা করেও যখন কাক্সিক্ষত সফলতা আসে না, ঋণের বোঝা পাহাড়সম হয়ে দাঁড়ায়, কিংবা রিযিকের তীব্র সংকট জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, তখন মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। মনে হয়, এ যেন এক অন্তহীন অন্ধকার। অথচ একজন মুমিনের জীবনে চরম হতাশার মধ্যেও একমাত্র আশার আলো হয়ে থাকে মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও অবিচল ভরসা।

পবিত্র কুরআনের সুরা আত্ব-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াত মানবজীবনের এই সংকটময় মুহূর্তগুলোর জন্য এক শক্তিশালী ও সান্ত্বনাদায়ক বার্তা বহন করে। এই আয়াতগুলো আমাদের শিক্ষা দেয়—যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর নির্দেশ মেনে চলে এবং তাঁর ওপর প্রকৃত ভরসা রাখে, আল্লাহ তার জন্য যেকোনো বিপদ থেকে উত্তরণের সহজ পথ তৈরি করে দেন। এমনকি এমন উৎস থেকে তাকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।

সুরা আত্ব-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াত

সুরা আত্ব-ত্বালাক, আয়াত ২: وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

সুরা আত্ব-ত্বালাক, আয়াত ৩: وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا

বাংলা উচ্চারণ: ওয়া মাইঁ ইয়াত্তাকিল্লাহা ইয়াজ‘আল লাহু মাখরাজা। ওয়া ইয়ারযুকহু মিন হাইছু লা ইয়াহতাসিব। ওয়া মাইঁ ইয়াতাওয়াক্কাল আলাল্লাহি ফাহুয়া হাসবুহু। ইন্নাল্লাহা বালিগু আমরিহি। ক্বাদ জা‘আলাল্লাহু লিকুল্লি শাইয়িন ক্বাদরা।

বাংলা অর্থ: “আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন। আর তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করে রেখেছেন।” (সূত্র: পবিত্র কুরআন, সুরা আত্ব-ত্বালাক, ৬৫:২–৩)

এই আয়াতগুলোর গভীর শিক্ষায় কেবল রিযিক বা জীবিকার কথা বলা হয়নি; বরং বিপদ থেকে মুক্তির পথ, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং তাঁর সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার প্রতি মানুষকে মনোযোগী করা হয়েছে।

জীবনে যখন কোনো সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান মেলে না, তখন মানুষ প্রায়ই মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। অথচ প্রকৃত সাহায্যকারী একমাত্র আল্লাহ। ইসলামে মানুষের সহযোগিতা চাওয়া নিষিদ্ধ নয়, তবে পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে কেবল সৃষ্টিকর্তার ওপর। আয়াতগুলোর মূল শিক্ষা হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি অবলম্বন করা, অন্যায় পরিহার করা এবং বৈধ উপায়ে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এরপর সব ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।

  • রিযিকের সংকট ও আর্থিক টানাপোড়েন: সংসারের ব্যয়ভার বহন করা বা ব্যবসায় বারবার লোকসানের মুখে হতাশ না হয়ে হালাল উপার্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ কোন দিক থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করবেন, তা মানুষের ধারণাতীত।
  • ঋণের বোঝা: ঋণ মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এমতাবস্থায় আল্লাহর কাছে দোয়ার পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব রাখা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং ধাপে ধাপে ঋণ পরিশোধের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা জরুরি।
  • দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা: বারবার চেষ্টা করেও সফলতার মুখ না দেখলে সব শেষ হয়ে গেছে বলে বসে থাকা যাবে না। একটি দরজা বন্ধ হওয়ার অর্থ জীবনের সব পথ বন্ধ হওয়া নয়। নিজের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।
  • মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা: ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বর্তমানের মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়। তাই সাধ্যমতো প্রচেষ্টা চালানোর পর বাকিটা আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সমর্পণ করাই মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।

ইসলামে ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর ভরসার অর্থ কখনোই কর্মবিমুখ হয়ে অলস বসে থাকা নয়। বরং বৈধ উপায়ে নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য ও শক্তি প্রয়োগ করার পর আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের রিযিক দিতেন, যেমন পাখিদের রিযিক দিয়ে থাকেন। তারা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট পুরে ফিরে আসে।” (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ২৩৪৪)

এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, পাখিরাও রিযিকের সন্ধানে বাসা থেকে উড়ে যায় অর্থাৎ চেষ্টা ও আল্লাহর ওপর ভরসা সমান্তরালে চলে। সুতরাং চাকরির জন্য আবেদন করা, ব্যবসায় সততা বজায় রাখা কিংবা অসুস্থতায় চিকিৎসা গ্রহণ করা—সবকিছুই এই চেষ্টার অন্তর্ভুক্ত।

সুরা আত্ব-ত্বালাকের এই আয়াতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি বা সংকট আল্লাহর অসীম রহমতের চেয়ে বড় হতে পারে না। তবে এর মানে এই নয় যে, নির্দিষ্ট কিছু আমল করলেই রাতারাতি সব ইচ্ছা পূরণ হয়ে যাবে। আল্লাহর প্রজ্ঞায় কোনো কিছু দ্রুত অর্জিত হয়, কোনো কিছু দেরিতে মেলে, আবার কিছু বিষয় থেকে দূরে রাখাই মানুষের প্রকৃত কল্যাণ হিসেবে নির্ধারিত থাকে।

তাই শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিরাশ না হয়ে হালাল পথে নিজের চেষ্টা অব্যাহত রাখুন এবং সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুন।

আপনি কি জীবনের কঠিন সময়ে কেবল সমস্যার কথা ভেবে হতাশ হন, নাকি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আপনার নিজ প্রচেষ্টাও ঠিকমতো চালিয়ে যান?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button