আইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রাম

বাঁশখালীতে ভুয়া SRB পরিচয়ে ব্যবসায়ী অপহরণ, টেকনাফ থেকে উদ্ধার; গ্রেপ্তার ৬

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নিজেদের SRB (সিকিউরিটি রিলেটেড ব্যুরো) সদস্য পরিচয় দিয়ে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ। এ ঘটনায় অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চাকরিচ্যুত এক সাবেক সেনাসদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় অপহরণে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার, কালো রঙের SRB লেখা পাঁচটি কটি, দুটি ভুয়া SRB পরিচয়পত্র এবং একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে ভুয়া পরিচয়ে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানাধীন পুঁইছড়ির প্রেমবাজার এলাকায় এ অপহরণের ঘটনা ঘটে। ওই এলাকার মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান বসে ছিলেন। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি কালো পোশাকের ওপর SRB লেখা কটি পরিহিত অবস্থায় দোকানে প্রবেশ করেন। তাঁদের মাথায় কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্ক ছিল। তাঁরা নিজেদের SRB সদস্য পরিচয় দিয়ে দোকানের ক্যাশে বসে থাকা ব্যবসায়ীর কাছে যান এবং তাঁর যমজ ভাই মো. হোছাইনের একটি ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী নিজের পরিচয় দিলে অভিযুক্তরা তাঁকে জোরপূর্বক আটক করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, অপহরণকারীরা ব্যবসায়ীর দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেন। এরপর তাঁকে টানাহেঁচড়া করে জোরপূর্বক দোকান থেকে বের করে একটি অজ্ঞাত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যান। পরে বিভিন্ন যানবাহনে স্থানান্তর করে তাঁকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো ঘটনায় অভিযুক্তরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের পরিচয় ব্যবহার করায় প্রথমদিকে তাঁদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্তে তাঁদের পরিচয় ও অপহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখে পুলিশ।

ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর একই দিন ১৭ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টা ৪০ মিনিট থেকে তাঁর স্ত্রী ও দোকানের ম্যানেজারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল করা হয়। ফোনে অপহরণকারীরা ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা পরিশোধ না করলে তাঁকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় অপহৃত ব্যবসায়ীর ভাই মো. হোছাইমের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা রুজু করা হয়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে অপহৃত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে জেলা পুলিশের একাধিক দল মাঠে নামে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিপিএমের দিকনির্দেশনায় সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে ডিবি ও বাঁশখালী থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। অপহরণকারীদের শনাক্ত, তাঁদের চলাচলের পথ নির্ধারণ এবং ভিকটিমের অবস্থান নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। পরে কয়েকটি আভিযানিক দল গঠন করে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের অংশ হিসেবে কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে নজরদারি বাড়ানো হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কক্সবাজার সদর থানাধীন বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে যৌথ আভিযানিক দল। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপহৃত ব্যবসায়ীর অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পরে ২১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় অপহরণকারীদের হেফাজত থেকে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ সময় অপহরণকারীদের কবজায় থাকার পর তাঁকে নিরাপদে উদ্ধার করতে সক্ষম হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ছয়জন হলেন গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানার বাসিন্দা চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা মিজানুর রহমান, উখিয়া উপজেলার বাসিন্দা জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাসিন্দা মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা রোহিঙ্গা নাগরিক মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং উদ্ধার করা আলামত পর্যালোচনা করে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।

গ্রেপ্তারকৃতদের হেফাজত থেকে অপহরণে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার, কালো রঙের SRB লেখা পাঁচটি কটি, দুটি ভুয়া SRB পরিচয়পত্র এবং একটি হ্যান্ডকাফ উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে অপহরণের মতো অপরাধ সংঘটিত করা হয়ে থাকতে পারে। তবে উদ্ধার করা প্রতিটি আলামতের ব্যবহার, অপরাধের সঙ্গে সেগুলোর সংশ্লিষ্টতা এবং অপহরণে ব্যবহৃত যানবাহনের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।

উদ্ধার করা আলামত

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি অতীতে উখিয়া এলাকায় SRB-তে কর্মরত থাকার সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তীতে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে তিনি চাকরিচ্যুত হন এবং কারাভোগ করেন বলে জানা গেছে। কারাগারে অবস্থানকালে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এরপর তিনি ভুয়া SRB পরিচয় ব্যবহার করে একটি দল গড়ে তোলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, ভুয়া SRB সদস্য পরিচয়ে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৩টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলার প্রকৃতি, বর্তমান অবস্থা এবং অপহরণের ঘটনার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাই করা হবে।

তদন্তে আরও জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ভিকটিমদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সুমন মুন্সিকে তথ্য সরবরাহ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সুমন ও তাঁর সহযোগীরা ভুয়া SRB পরিচয় ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আটক এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। অপহৃত ব্যক্তিকে ক্যাম্প এলাকায় আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না এবং একই কৌশলে অতীতে অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে তিনটি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে, ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব মামলার বিস্তারিত অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর বর্তমান আইনগত অবস্থান যাচাই করা হচ্ছে।

ভুয়া পরিচয়পত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মতো পোশাক ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ধরনের প্রতারণামূলক পরিচয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আটক, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করা হলে তা প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ আছে কি না, অপহরণের পরিকল্পনা কীভাবে করা হয়েছিল এবং মুক্তিপণের অর্থ আদায়ে কারা যোগাযোগ করেছিল, সেসব বিষয়েও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এই অভিযানে অপহৃত ব্যবসায়ীকে জীবিত উদ্ধার এবং ছয়জনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তবে অপহরণে প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা, সম্ভাব্য সহযোগীদের পরিচয় এবং মুক্তিপণ দাবির পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য করা যায় না। পুলিশি তদন্তের অগ্রগতি এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এ ঘটনার সব তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button