চট্টগ্রামের দুই আলোচিত হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামের আলোচিত দুটি হত্যা মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর মধ্যে নগরের বাকলিয়া থানার জোড়া খুনের মামলায় পাঁচ দিন এবং বায়েজিদ বোস্তামী থানার সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যা মামলায় দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। পৃথক শুনানি শেষে বুধবার (২৮ অক্টোবর) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদ ও মো. আলমগীর হোসেনের আদালত এ আদেশ দেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী রিমান্ড মঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রিমান্ড শুনানির জন্য বুধবার দুপুরে ডেভিড ইমনকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে বাকলিয়া থানার জোড়া খুনের মামলায় পাঁচ দিন এবং বায়েজিদ বোস্তামী থানার সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলায় দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ মার্চ রাতে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় একটি ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় বখতিয়ার হোসেন মানিক ও আবদুল্লাহ আল রিফাত নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন আরও দুজন।
চাঞ্চল্যকর এ জোড়া খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ডেভিড ইমনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের পরিকল্পনা, সহযোগীদের ভূমিকা এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করবে তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
অন্যদিকে, নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী খোন্দকিয়া পাড়া এলাকায় বিএনপির নির্বাচনি প্রচারণার সময় গুলিতে নিহত হন সরোয়ার হোসেন বাবলা। এ ঘটনায় তাঁর বাবা আবদুল কাদের বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।মামলায় বিদেশে পলাতক হিসেবে উল্লেখিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নাম উল্লেখ করা আসামিদের মধ্যে ডেভিড ইমনও রয়েছেন। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দুটি হত্যা মামলায় পৃথকভাবে রিমান্ড মঞ্জুরের মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন তথ্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অস্ত্রের ব্যবহার, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অভিযুক্তদের পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়ে তদন্তকারীরা তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুলাই যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনকে তাঁর তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তাঁরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে চট্টগ্রামে এনে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব মামলার মধ্যে একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকায় তাঁকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নগরবাসীর মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
ডেভিড ইমনকে ঘিরে আলোচনার পাশাপাশি তাঁর কথিত হুমকি-ধমকি ও অপরাধী নেটওয়ার্ক নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগরীর একাধিক সচেতন নাগরিক। তাঁদের অভিযোগ, তাঁর হুমকি-ধমকির আশঙ্কা থেকে সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যরাও রেহাই পাননি। এ ছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে—এমন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সচেতন মহলের দাবি, শুধু আলোচিত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করেই অভিযান শেষ করা উচিত নয়। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন অস্ত্রধারী সহযোগী, অপরাধে সহায়তাকারী এবং অপরাধী চক্রের অন্য সদস্যদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের উৎস, অস্ত্র সরবরাহের পথ, অপরাধীদের আশ্রয়দাতা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হত্যা, অস্ত্রের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির অভিযোগে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের মতে, অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা পেশিশক্তি যেন আইনের প্রয়োগে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
বিশেষ করে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের নিরাপত্তা এবং পুলিশের ওপর চাপ বা হুমকির অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা জরুরি। কারণ, সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অপরাধ আড়াল করার সুযোগ তৈরি হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট দুই হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের সাত দিনের রিমান্ডকে কেন্দ্র করে এখন তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সচেতন মহলের প্রত্যাশা, জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড দুটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি অপরাধে জড়িত অন্যদের পরিচয়ও সামনে আসবে। তাঁদের মতে, চট্টগ্রাম নগরীতে সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক গোয়েন্দা নজরদারি, অপরাধীদের নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ এবং মামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত। একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এখন দেখার বিষয়, আদালতের দেওয়া সাত দিনের রিমান্ডে তদন্তকারীরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন এবং আলোচিত দুই হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা অন্য অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পারেন কি না। নগরবাসীর প্রত্যাশা, এসব মামলার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং চট্টগ্রামে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।



