চট্টগ্রাম

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলামের উদ্যোগে চট্টগ্রামে এক দিনে লাখো বৃক্ষরোপণ

মুহাম্মদ জুবাইর: পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে চট্টগ্রামে এক দিনে এক লাখ গাছ রোপণ কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করেছে জেলা প্রশাসন। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জেলার ১৬টি উপজেলা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে একযোগে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। এতে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জেলার বিভিন্ন স্থানে এক লাখ বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়।

সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বন বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে আয়োজিত এ কর্মসূচিকে পরিবেশ সংরক্ষণে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু গাছ লাগানো নয়, রোপণ করা চারাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা, নিয়মিত পরিচর্যা করা এবং ভবিষ্যতে একটি সবুজ ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কর্মসূচিটি সাজানো হয়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে সারা দেশের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি অন্যান্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও নিজ নিজ এলাকায় এ ধরনের সমন্বিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সরকারের বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে আরও বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব।

মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি নারকেল গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। উদ্বোধনের পর জেলার বিভিন্ন উপজেলা, নগর এলাকা, সড়কের পাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপযোগী স্থানে দিনব্যাপী চারা রোপণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কর্মসূচির আওতায় জেলার ১৬টি উপজেলাসহ মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে একযোগে বৃক্ষরোপণ করা হয়। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবক, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্য এবং পরিবেশসচেতন মানুষ অংশ নেন। দিনভর বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শেষে সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটসংলগ্ন ডিসি পার্কে র‍্যালির আয়োজন করা হয়। পরে উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর হাতে এক লাখতম চারা হিসেবে আরেকটি নারকেল গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। প্রতীকী এ সমাপনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এ কর্মসূচি গ্রহণ করে। কর্মসূচির প্রতিপাদ্য ছিল—‘এক দিনে লক্ষ বৃক্ষ, সবুজ পরিবেশ আমাদের লক্ষ্য’। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বৃক্ষরোপণকে কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চারা সংগ্রহ থেকে শুরু করে সেগুলো বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া, রোপণের জন্য গর্ত প্রস্তুত করা এবং যথাযথভাবে চারা লাগানোর কাজ সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করা হয়। উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বন বিভাগ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বেসরকারি সংস্থা এ কাজে সহযোগিতা করে।

কর্মসূচিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন একাই ৪০ হাজার চারা সরবরাহ করে। এ সহযোগিতা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জেলা প্রশাসক জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারি কোনো অর্থ ব্যয় ছাড়াই পুরো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশ বিবেচনায় চারা নির্বাচন
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্থানীয় পরিবেশ, মাটি ও প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চারা নির্বাচন করা। সব এলাকায় একই ধরনের গাছ না লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপযোগিতা ও চারার টিকে থাকার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। উপকূলীয় পরিবেশ বিবেচনায় সন্দ্বীপে প্রায় এক হাজার নারকেল গাছের চারা রোপণের ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে আনোয়ারা উপজেলায় ২০ হাজার চারা রোপণের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হয়।

পরিবেশের জন্য উপযোগী গাছ নির্বাচন করা হলে চারার বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সংরক্ষণেও তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে চারা রোপণের পাশাপাশি সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা এবং প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থেকে সুরক্ষার বিষয়টিও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর রোপণ করা চারাগুলোর সুরক্ষা ও পরিচর্যাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

তিনি বলেন, “গাছ লাগালাম কিন্তু সেগুলো বেঁচে থাকল না—তাহলে আমাদের সমস্ত উদ্যোগ নিষ্ফল হয়ে যাবে।”
জেলা প্রশাসকের এ বক্তব্যে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি চারাগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে গাছ লাগানোই শেষ কথা নয়; বরং সেগুলোকে বড় করে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের উপকারে আসার উপযোগী করে গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এ জন্য রোপণ করা চারার চারপাশে বেড়া দেওয়া, পরিচর্যা ও তদারকির জন্য কমিটি গঠন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার চারা মজুত রাখার পরিকল্পনাও করা হয়েছে, যাতে কোনো স্থানে চারা নষ্ট হয়ে গেলে বা নতুন করে চারা লাগানোর প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। পরিচর্যার কার্যক্রমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, গ্রাম পুলিশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে চারাগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা ও সুরক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের প্রত্যাশা, এ ধরনের সমন্বিত তদারকি ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে রোপণ করা চারার অপচয় কমবে এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা সহজ হবে। ‘পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন, বেঁচে থাকার আন্দোলন’ কর্মসূচি নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “আমরা বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি নিয়ে আন্দোলন করি। কিন্তু আজ আমাদের এই ১৫ হাজার মানুষের আন্দোলন ছিল পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন। এই আন্দোলন আমাদের বেঁচে থাকার আন্দোলন, আমাদের আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার আন্দোলন।” তাঁর এ বক্তব্যে পরিবেশ সংরক্ষণকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে বৃক্ষরোপণকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করে সঠিক স্থানে গাছ লাগানো, চারার পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো সংরক্ষণের ওপর।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এক দিনে এক লাখ গাছ রোপণের কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং সামাজিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ এ উদ্যোগকে একটি জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে পরিণত করেছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আজকের এই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন যে কাজটি করল, যে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হাতে নিল, আমি মনে করি, এই ধারা যদি আমরা সারা দেশে অনুসরণ করি, তাহলে অচিরেই আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে যেতে পারব।”
তিনি সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী হলেও অসম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, প্রশাসন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
উপদেষ্টা মনে করেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় প্রয়োজন ও পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে বৃক্ষরোপণের কার্যক্রম আরও গতিশীল হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তিনি বৃক্ষরোপণকে শুধু নির্দিষ্ট দিনে চারা লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গাছের পরিচর্যা, সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তোলার সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, একটি গাছ রোপণের পর সেটিকে যথাযথভাবে পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে রাখা হলে তবেই বৃক্ষরোপণের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব।

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতায় পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকির বিষয়টিও বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ি ভূমি, উপকূলীয় অঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকার পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন। বৃক্ষরোপণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ প্রতিরোধে শুধু গাছ লাগানো যথেষ্ট নয়; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, পাহাড় কাটা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপও জরুরি। এ কারণে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান উপদেষ্টা।
প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ
চট্টগ্রামের এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। চারা সংগ্রহ, পরিবহন, বিতরণ, রোপণের স্থান নির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করে। কর্মসূচিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, রেড ক্রিসেন্টের সদস্য এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের ফলে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমটি প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির রূপ পায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ ও সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি কর্নেল খলিল উল্লাহ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন এবং জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। এ ছাড়া কর্মসূচির বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা অংশ নেন। নারায়ণগঞ্জেও এক লাখ গাছ রোপণের অভিজ্ঞতা ছিল জেলা প্রশাসকের
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে এ ধরনের উদ্যোগ নতুন নয়। এর আগে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক থাকাকালে তিনি দুই মাসে এক লাখ গাছ রোপণের কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
২০২৫ সালের ১০ মে শুরু হওয়া ওই কর্মসূচি একই বছরের ১০ জুলাই শেষ হয়। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার সড়কদ্বীপে এক লাখতম গাছ হিসেবে একটি কৃষ্ণচূড়া চারা রোপণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছিল।
নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া সেই উদ্যোগের পর চট্টগ্রামে এক দিনে এক লাখ গাছ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন তাঁর বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে চট্টগ্রামের কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো, অল্প সময়ের মধ্যে জেলার ১৬টি উপজেলা ও মহানগরীকে সম্পৃক্ত করে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে একযোগে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করা। একই সঙ্গে চারা রোপণের পর সেগুলোর পরিচর্যা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
সবুজ চট্টগ্রাম গড়তে প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ
এক দিনে এক লাখ গাছ রোপণের এ কর্মসূচি চট্টগ্রামে পরিবেশ সংরক্ষণে একটি বড় ধরনের জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে রোপণ করা চারাগুলোর কতগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, সেগুলো নিয়মিত পরিচর্যা পায় কি না এবং ভবিষ্যতে বৃক্ষরোপণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে কি না—তার ওপর।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, ছায়া সৃষ্টি, জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল গড়ে তোলা এবং কার্বন শোষণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সুফল পেতে স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী প্রজাতি নির্বাচন, যথাযথ স্থানে চারা রোপণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টার আহ্বানে এ ধরনের কর্মসূচি দেশের অন্যান্য জেলাতেও বিস্তৃত হলে জাতীয় বৃক্ষরোপণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা আরও জোরদার হতে পারে।
সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে চট্টগ্রামের এ উদ্যোগ এখন কতটা দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন করতে পারে, তা নির্ভর করবে রোপণ করা প্রতিটি চারাকে সুরক্ষা দেওয়া, পরিচর্যা অব্যাহত রাখা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে মানুষের দৈনন্দিন সামাজিক দায়িত্বে পরিণত করার ওপর। এক দিনের কর্মসূচি থেকে যদি ধারাবাহিক পরিচর্যা ও সচেতনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তবেই এ উদ্যোগ আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button