তাকওয়াই হলো গুনাহ থেকে বাঁচার একমাত্র মহৌষধি: তিন ঐতিহাসিক ঘটনার আলোকেও তাকওয়ার গুরুত্ব
ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: পৃথিবীতে এমন কোনো ভৌগোলিক স্থান বা পরিবেশ নেই, যেখানে শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে সেখানে গেলে মানুষ আর কখনো কোনো গুনাহ করবে না। শয়তানের প্ররোচনা এবং মানুষের প্রবৃত্তি যেকোনো জায়গায়ই মানুষকে অপরাধে লিপ্ত করতে পারে। তবে মানুষের জীবনকে এই পাপাচার ও ফেতনা থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা এক অব্যর্থ মহৌষধি দান করেছেন, যার নাম ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহর ভয়।
আজ সমাজে আমরা নানা ধরনের সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে হাজারো আলোচনা করি, কিন্তু অন্তরে আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া অর্জনের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। সন্তানকে আমরা নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, আমল ও আদব-কায়দা শিখাই, কিন্তু তাদের হৃদয়ে তাকওয়ার বীজ বুনতে ভুলে যাই। অথচ কারো মাথায় যদি এলেমের পাহাড়ও থাকে, কিন্তু অন্তরে তাকওয়া না থাকে, তবে সেই এলেম তার কোনো উপকারে আসবে না। এর বিপরীতে, যার তাকওয়া আছে অথচ সাধারণ জ্ঞান রয়েছে, সেই তাকওয়াই তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের নাজাতের পথ দেখাতে পারে।
সব মানুষই সাধারণত ভালো ও মন্দের তফাত জানে, কোনটা সওয়াব আর কোনটা গুনাহ তাও সবার জানা। এর পরও মানুষ যখন গুনাহের সাগরে ডুবে যায় এবং নফসের কাছে হেরে বসে, তার একমাত্র কারণ হলো অন্তরে পরিপূর্ণ তাকওয়ার অনুপস্থিতি।
তাকওয়ার প্রকৃত রূপ কেমন হতে পারে, তা ইসলামের সোনালী ইতিহাস থেকে তিনটি চমৎকার ঘটনার মাধ্যমে অনুধাবন করা যায়:
১. রাখাল বালকের তাকওয়া:
একবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) সফরে গিয়ে এক রাখাল বালককে তার ভেড়ার পালসহ দেখতে পান। তিনি বালকটিকে একটি ভেড়া তাঁর কাছে বিক্রি করার প্রস্তাব দিলে বালকটি জানায় ভেড়াগুলো তার নয়, বরং তার মালিকের। ইবনে উমর (রা.) তাকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন, “মালিককে বলে দিও যে একটি ভেড়া নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে।” তখন সেই বালকটি পাহাড়ের নির্জন পরিবেশে দাঁড়িয়ে এমন এক ঈমানদীপ্ত উত্তর দিল, যা আজও মানুষের হৃদয়ে তাকওয়ার আলো জ্বেলে দেয়। সে বলল, “আমার মালিক তো আমাকে দেখছেন না, কিন্তু আল্লাহ তো আমাকে দেখছেন!” মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও আল্লাহর নজরদারি থেকে যে বাঁচার উপায় নেই, এই দৃঢ় বিশ্বাসই তাকে অপরাধ থেকে রক্ষা করেছিল। (সূত্র: আল-মু‘জামুল কাবীর, ইমাম তাবারানী)
২. যে ছাত্র আল্লাহকে দেখার কথা ভুলতে পারেনি:
প্রখ্যাত বুজুর্গ হজরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহ.) তাঁর এক ছাত্রকে অন্যদের চেয়ে বেশি স্নেহ করতেন। বাকি ছাত্রদের মনে প্রশ্ন জাগলে তিনি তাদের প্রত্যেককে একটি করে মুরগি দিয়ে এমন কোনো নির্জন স্থানে জবাই করে আনতে বললেন, যেখানে কেউ তাদের দেখতে পাবে না। সবাই লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে মুরগি জবাই করে ফিরে এলেও ওই প্রিয় ছাত্রটি মুরগিটি জ্যান্ত অবস্থায় ফেরত নিয়ে এল। কারণ জানতে চাইলে সে বলল, “আপনি এমন জায়গায় জবাই করতে বলেছেন যেখানে কেউ দেখবে না, কিন্তু আমি তো এমন কোনো স্থান খুঁজে পাইনি, যেখানে আল্লাহ আমাকে দেখেন না!” সে নির্জনতার মধ্যেও আল্লাহর নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি ও নজরদারি অনুভব করেছিল।
৩. আল্লাহর ভয়ে তরুণ যুবকের প্রাণত্যাগ:
হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে এক যুবক নিয়মিত দ্বীনি মজলিসে আসত। একবার কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় সে এক নারীর প্রলোভনে পড়ে গুনাহ করার উদ্দেশ্যে তার ঘরের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয় তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে সে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। পরবর্তীতে জ্ঞান ফেরার পর সে তার পিতাকে পুরো ঘটনাটি জানিয়ে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে মারা যায়। পরে এই ঘটনা হজরত উমর (রা.)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি তার কবরের পাশে গিয়ে সুরা আর-রহমানের সেই বিখ্যাত আয়াতটি তিলাওয়াত করেন— “আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।” (সুরা আর-রহমান, ৫৫:৪৬)। তখন কবর থেকে আওয়াজ আসে, হে আমিরুল মুমিনিন, আমার রব আমাকে সেই দুটি জান্নাত দান করেছেন! (সূত্র: ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক এবং বায়হাকী)
আজ আমরা চারপাশ থেকে নানা অশ্লীলতা ও ফেতনার জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি। আমাদের পরিবার ও সন্তানরাও এর বাইরে নয়। এই সর্বগ্রাসী ফেতনা থেকে বাঁচার একমাত্র হাতিয়ার হলো তাকওয়া। সন্তানের জন্য দুনিয়াবি সফলতার পাশাপাশি আল্লাহর ভয় অর্জনের দুআ করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
শেষ রাতে বিছানা ছেড়ে দুই ফোঁটা চোখের জলে আল্লাহর দরবারে এই মিনতিই করা উচিত—
“হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে দুনিয়ায় আর কিছু দেন বা না দেন, তাকওয়া দান করুন। তার অন্তরে, আমার পরিবারে এবং আমাদের সকলের অন্তরে আপনার ভয় ঢেলে দিন।”



