ইসলাম ধর্মধর্ম ও জীবন

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অলৌকিক ‘মিরাজ’ ও নামাজের উপহার

ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর, মহিমান্বিত ও অলৌকিক ঘটনার একটি হলো প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ‘মিরাজ’ বা ঊর্ধ্বগমন সফর। মানুষের সীমিত জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তার পরিধিকে ছাড়িয়ে যাওয়া এই ঘটনাটি কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না; বরং এটি ছিল চরম দুশ্চিন্তা ও বেদনার দিনে প্রিয়নবীর প্রতি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য সান্ত্বনা, বিশেষ সম্মান এবং সমগ্র উম্মতের জন্য আসমানি উপহাদ অর্জনের সুমহান মাধ্যম।

১. দুঃখের বছর ও আসমানি যাত্রার সূচনা

নবুওয়তের অত্যন্ত সংকটময় ও বেদনাদায়ক এক সময়ে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। একদিকে প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) ও মমতাময় চাচা আবু তালিবের ইন্তেকাল (যাকে ‘আমুল হুজন’ বা শোকের বছর বলা হয়), অন্যদিকে মক্কার কুরাইশদের অকথ্য নির্যাতন ও অস্বীকৃতি—সবমিলিয়ে প্রিয়নবী (সা.) গভীর মনঃকষ্টের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছিলেন।

ঠিক এমন এক কঠিন ও সান্ত্বনাহীন মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবিবকে সান্ত্বনা দিতে এবং সৃষ্টির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে আসমানি দরবারে অভ্যর্থনা জানাতে ইচ্ছা করলেন। এক রাতে ফেরেশতাকুলপ্রধান হযরত জিবরাইল (আ.) বিশেষ বাহন ‘বুরাক’ নিয়ে হাজির হন। সেই পবিত্র বাহনে চড়ে নবীজি (সা.) মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের পবিত্র মসজিদুল আকসায় পৌঁছান। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী সকল নবীর ইমামতি করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন, যা প্রমাণ করে যে তিনি সকল নবীর মুকুটমণি ও ইমাম।

২. সাত আসমান ভ্রমণ ও বিভিন্ন নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ

মসজিদুল আকসা থেকে শুরু হয় ঊর্ধ্বজগতের সেই ঐতিহাসিক ও রহস্যময় সফর। হজরত জিবরাইল (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একের পর এক আসমান ভেদ করে উঁচুতে উঠতে থাকেন এবং প্রতিটি আসমানে আগের নবীদের সাথে তাঁর মোলাকাত হয়:

  • প্রথম আসমান: মানবজাতির আদিপিতা হযরত আদম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • দ্বিতীয় আসমান: হজরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • তৃতীয় আসমান: রূপের উপমা ও নবী হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • চতুর্থ আসমান: হযরত ইদরিস (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • পঞ্চম আসমান: হযরত হারুন (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • ষষ্ঠ আসমান: হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।
  • সপ্তম আসমান: সমগ্র মিল্লাতে ইব্রাহিমের পিতা হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ।

প্রত্যেক নবী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান, তাঁর নবুওয়তের মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেন এবং তাঁর জন্য কল্যাণ ও বরকতের দোয়া করেন। এরপর নবীজি (সা.) পৌঁছান ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পর্যন্ত—যা সৃষ্টিজগতের শেষ সীমানা এবং মানব বুদ্ধির অগম্য এক পবিত্র স্থান।

৩. আল্লাহর নৈকট্য ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উপহার

এই সফরেই মহানবী (সা.) আল্লাহর অতি নিকটবর্তী হন এবং সরাসরি মহান রবের পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা ও উপহার লাভ করেন। এই মিরাজের রাতেই উম্মতের ওপর প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছিল।

এরপর ফেরার পথে ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.)-এর সাথে দেখা হলে তিনি নবীজিকে পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, আপনার উম্মত এত বেশি নামাজ আদায় করতে সক্ষম হবে না; তাই আল্লাহর দরবারে তা আরও কমিয়ে দেওয়ার আবেদন করুন। প্রিয়নবী (সা.) বারবার আল্লাহর দরবারে গিয়ে তা কমানোর আবেদন করেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা দয়া করে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারণ করে দেন। তবে পরম করুণাময় ঘোষণা করেন যে— সংখ্যায় মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত হলেও, আমলের পাল্লায় এর সওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তেরই সমান গণ্য করা হবে! এভাবেই উম্মতে মুহাম্মদির জন্য উপহার হিসেবে নির্ধারিত হয় পবিত্র পাঁচ ওয়াক্ত সালাত।

৪. ফিরে আসা এবং ‘সিদ্দিকে আকবর’ উপাধি প্রাপ্তি

এই অলৌকিক সফর শেষে নবীজি (সা.) রাতেই আবার মক্কায় ফিরে আসেন। পরের দিন সকালে তিনি যখন এই অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা মক্কার মানুষকে জানান, তখন অবিশ্বাসীরা তাঁকে নিয়ে উপহাস শুরু করে। কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ইমানের অটল পাহাড় হযরত আবু বকর (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ঘোষণা করেন— “তিনি যদি বলে থাকেন, তবে তা ১০০% সত্য!” এই দৃঢ় বিশ্বাসের কারণেই তিনি ‘সিদ্দীক’ (সর্বোচ্চ সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত হন।

আমাদের জন্য শিক্ষা

মিরাজের এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের বাস্তব জীবনে অত্যন্ত গভীর বার্তা দেয়:

  • হতাশ না হওয়া: জীবনে যত বড় দুঃখ, কষ্ট বা সংকটই আসুক না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না। কষ্টের পরেই আল্লাহ সহজ ও সুন্দর পথ উন্মুক্ত করে দেন।
  • নামাজের গুরুত্ব: মিরাজের সবচেয়ে বড় উপহার হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। এটি কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং মুমিনের জন্য ‘মিরাক’ বা রবের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যম। তাই জীবনের ব্যস্ততায়ও নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া প্রতিটি মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রিয়নবীর এই মিরাজের শিক্ষা ধারণ করার এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button