ইসলাম ধর্মধর্ম ও জীবন

কেমন পীর বা পথপ্রদর্শকের অনুসরণ করবেন না এবং কাদের সাহচর্য গ্রহণ করবেন

ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: দ্বীনের পথে চলায় একজন আলেম, পির বা দ্বীনি পথপ্রদর্শকের সঠিক সাহচর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব ধর্মীয় ব্যক্তিই মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না। অনেকে দ্বীনের নামে কুসংস্কার ও বিভ্রান্তি ছড়ান, আবার কেউ কেউ ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে অনুসারীদের মধ্যে অহংকার, বিদ্বেষ ও দলীয় সংকীর্ণতা তৈরি করেন। তাই বাহ্যিক ধার্মিকতা, জনপ্রিয়তা বা অলৌকিক দাবিতে মুগ্ধ না হয়ে দেখতে হবে—তাঁর শিক্ষা ও আচরণ কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দ্বীনের নামে প্রতারণা থেকে বাঁচার জন্য ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা নিচে তুলে ধরা হলো:

কেমন পীরের অনুসরণ করবেন না (১৯টি সতর্কবার্তা)

১. মৃত ব্যক্তির উসিলায় রিজিক ও মুক্তি চাওয়া: যে পির মৃত ব্যক্তিদের মাধ্যমে রিজিক, মুক্তি, সম্পদ কিংবা আরোগ্য লাভের পথ দেখান।

২. বাদ্যযন্ত্র ও নাচ-গান: যে পির বাদ্যযন্ত্র ও নাচ-গানের সঙ্গে আল্লাহর জিকির করাকে বৈধ বলে প্রচার করেন।

৩. লাফালাফি করে কবিতা পাঠ: যে পির বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে লাফালাফি করে যুহদ ও দুনিয়াবিমুখতার কবিতা পাঠ করাকে দ্বীনের বিশেষ আমল হিসেবে বৈধতা দেন।

৪. ‘বান্দাই রব’ আকিদা: যে পির বলেন, ‘বান্দাই রব, আর রবই বান্দা’।

৫. ওয়াহদাতুল উজুদ: যে পির ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ বা স্রষ্টা ও সৃষ্টির সত্তা এক—এমন আকিদার পক্ষে সাফাই গান।

৬. সর্বশেষ ওলি বা গায়েব জানার দাবি: যে পির নিজেকে ‘খতমুল আউলিয়া’ বা সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ ওলি হিসেবে দাবি করেন এবং দাবি করেন যে তিনি গোপন বিষয় বা ভবিষ্যৎ জানেন (এর আড়ালে জিন তাড়ানোর বা গায়েব জানার মিথ্যা দাবি থাকতে পারে)।

৭. সুন্নাহকে তুচ্ছ করা: যে পির আপনার চোখে সুন্নাহর প্রকাশ্য নিদর্শনগুলোকে তুচ্ছ করে তোলেন।

৮. কবরের পাশে নামাজকে উত্তম বলা: যে পির বলেন, সাধারণ মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে নেককার ব্যক্তিদের কবরের পাশে নামাজ পড়া বেশি উত্তম।

৯. দলান্ধতা ও শত্রুতা: যে পির ইজতিহাদনির্ভর বা মতভেদপূর্ণ বিষয়ে অন্য মুসলিমদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করতে এবং তাদের বিদআতি আখ্যা দিতে শেখান।

১০. বিনা দলিলে বিশেষ দরুদ: যে পির দলিল ছাড়া নিজ থেকে দরুদের বিশেষ ফজিলত ও বাক্য নির্ধারণ করে দেন।

১১. কবর স্পর্শ করা: যে পির আপনাকে কবরের সঙ্গে গা ঘষতে বা কবর স্পর্শ করে বরকত লাভ করতে উৎসাহিত করেন।

১২. নবীজির নূরানিয়াত নিয়ে বাড়াবাড়ি: যে পির রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁকে আল্লাহর সত্তাগত নূর বলে দাবি করেন এবং তাঁকে আমাদের মতোই মানুষ হিসেবে মানতে অস্বীকার করেন।

১৩. মাজলিসকে জামাতের চেয়ে উত্তম বলা: যে পির দাবি করেন, তাঁর মজলিসে বসে থাকা মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় করতে যাওয়ার চেয়েও উত্তম।

১৪. বিদ্বেষ ছড়ানো: যে পির মতবিরোধীদের সঙ্গে শিষ্টাচার বজায় রাখতে শেখান না, বরং অন্তরে বিদ্বেষ ও অহংকার লালন করতে শেখান।

১৫. আত্মম্ভরিতা ও প্রশংসা প্রিয়তা: যে পির নিজের প্রশংসা শুনে আনন্দিত হন এবং অনুসারীদের দিয়ে নিজের গুণকীর্তন করাতে ভালোবাসেন।

১৬. অদৃশ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতির দাবি: যে পির দাবি করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.), খোলাফায়ে রাশেদীন বা বিভিন্ন ওলি তাঁর মজলিসে নিয়মিত উপস্থিত হন।

১৭. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা: যে পিরের মজলিসে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয় এবং তিনি তা রোধে কোনো সতর্কতা নেন না।

১৮. শরীয়তবহির্ভূত শারীরিক সংস্পর্শ: যে পিরের হাতে নারীরা চুমু খান এবং অসতর্ক বা অনুচিত শারীরিক আচরণকে স্বাভাবিক করে তোলেন।

১৯. কবর জিয়ারতের নামে সফর: যে পির কোনো মৃত ব্যক্তির কবরকে বিশেষভাবে মহিমান্বিত করা কিংবা সেখান থেকে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট করে সফর করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

তাহলে কাদের অনুসরণ করবেন?

  • কুরআন-সুন্নাহর বাস্তব অনুসারী: এমন আলেম ও পিরের সাহচর্য গ্রহণ করুন, যাঁরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—শুধু মুখের কথায় নয়, বাস্তব আমল ও আচরণেও—কুরআন ও সুন্নাহর নিখাদ অনুসারী।
  • আত্মশুদ্ধি ও বিনয়: প্রকৃত দ্বীনদারি মানুষকে আত্মিকভাবে উন্নত করে, দুনিয়ার মোহ কমায়, শরীঅতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শেখায় এবং অহংকারের পরিবর্তে বিনয়ী করে তোলে।
  • পূর্বসূরিদের আদর্শ: ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ, জুনায়েদ বাগদাদী, আবদুল কাদের জিলানী, আহমদ আর-রিফাঈ (রহ.)-এর মতো প্রখ্যাত ইমাম ও আল্লাহওয়ালাদের জীবন ও শিক্ষা থেকে আমাদের পথনির্দেশ নেওয়া উচিত।

পরিশেষে: কোনো ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং সত্যকে জানুন, দলিলকে গুরুত্ব দিন এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মানুষকে মূল্যায়ন করুন। প্রকৃত আলেম আপনাকে নিজের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত করতে চান না; বরং আল্লাহর আনুগত্য ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসারী হতে শেখান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button