ইসলাম ধর্মধর্ম ও জীবন

মৃত্যুর মুহূর্তের ভয়ংকর পরীক্ষা ও নেক আমলের অলৌকিক সুরক্ষা

ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ যখন দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝের এক ভয়ঙ্কর সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়, তখন তার সারাজীবনের আমলই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। বিখ্যাত তাবেঈ হজরত দাউদ বিন আবি হিন্দ (রহ.)-এর জীবনের এক অলৌকিক ও লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনায় এই চিরন্তন সত্যটিই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কীভাবে বান্দার সৎকর্ম ও ইবাদত মৃত্যুর সেই কঠিন মুহূর্তে রহমতের ফেরেশতাদের উসিলায় আযাবের ফেরেশতাদের তাড়িয়ে দেয়, এই ঘটনা তারই এক অনন্য দলিল।

১. মৃত্যুর চরম অসুস্থতা ও ভয়ংকর অভিজ্ঞতা

হজরত দাউদ বিন আবি হিন্দ (রহ.) একবার মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, এটাই তাঁর জীবনের শেষ সময় বা মৃত্যুর মুহূর্ত। তিনি বর্ণনা করেন, তাঁর শোয়ার বিছানা থেকে ঘরের দরজা হয়ে সরাসরি বাইরের রাস্তা দেখা যেত।

মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ তিনি দেখতে পান, মূল দরজা দিয়ে অত্যন্ত বিশাল আকৃতির এক ভয়ঙ্কর ও কালো চেহারাবিহীন লোক তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। তার শরীর ও কাঁধ এত প্রকাণ্ড ছিল যে তাকে কোনো এক ভয়ানক দানবের মতো মনে হচ্ছিল। তা দেখেই দাউদ বিন আবি হিন্দ (রহ.) শিউরে ওঠেন। কারণ তিনি আগে থেকেই শুনেছিলেন যে, কাফের বা চরম গুনাহগারদের জান কবজ করার জন্যই এমন ভীতিকর চেহারার ফেরেশতারা আসেন। তিনি মনে মনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং ভাবেন—তবে কি তিনি কাফের বা গুনাহগার অবস্থায় মৃত্যুবরণ করছেন?

২. রহমতের ফেরেশতাদের আগমন ও আযাবের ফেরেশতার প্রস্থান

তিনি যখন চরম আতঙ্ক ও ভয়ে কাঁপছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে হুট করে ঘরের ছাদ মড়মড় করে ভেঙে দুভাগ হয়ে যায়। বিছানায় শুয়েই তিনি সরাসরি আসমান দেখতে পান।

তক্ষণাৎ আসমান থেকে ধবধবে সাদা পোশাক পরা এক জ্যোতির্ময় ব্যক্তি নিচে নেমে আসেন, আর তাঁর ঠিক পেছনেই নেমে আসেন আরও একজন। তাঁরা দুজনে এসেই সেই কালো ও ভয়ংকর লোকটিকে কড়া ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেন। ভয়ের চোটে সেই ভয়ংকর মূর্তিটি দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

এরপর সাদা পোশাকধারী সেই দুই ফেরেশতার একজন তাঁর মাথার কাছে এবং অপরজন তাঁর পায়ের কাছে এসে বসেন।

৩. পা ও জিহ্বার পরীক্ষা

বিপদসঙ্কুল সেই মুহূর্তে ফেরেশতাদ্বয় দাউদ বিন আবি হিন্দ (রহ.)-কে নিয়ে একটি বিশেষ পরীক্ষা চালান।

  • পায়ের পরীক্ষা: মাথার কাছের জন পায়ের কাছের জনকে বললেন, “ওকে একটু ছুঁয়ে দেখো তো!” তখন পায়ের কাছের জন তাঁর পায়ের আঙুলগুলোর মাঝখানে হাত বুলিয়ে বললেন, “এই পা দুটি তো নামাজের জন্য (মসজিদের দিকে) অনেক বেশি হেঁটেছে!”
  • জিহ্বার পরীক্ষা: এরপর পায়ের কাছের জন মাথার কাছের জনকে বললেন, “এবার তুমি একটু ছুঁয়ে দেখো!” তখন মাথার কাছের জন তাঁর জিহ্বা স্পর্শ করে বললেন, “তার জিহ্বা ও গলা তো আল্লাহর জিকিরে সবসময় সিক্ত থাকে!”

এই পরীক্ষার পর তাঁরা পরস্পরকে নিশ্চিত করলেন যে, “না, তার মৃত্যুর সময় এখনো হয়নি!” এই কথা বলার সাথে সাথেই ঘরের ভাঙা ছাদ আগের মতো জোড়া লেগে গেল এবং তাঁরা দুজন আসমানে ফিরে গেলেন।

৪. অলৌকিক সুস্থতা ও আল্লাহর রহমত

এই ঘটনার কিছুদিন পর হজরত দাউদ বিন আবি হিন্দ (রহ.) অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে মানুষের কাছে এই বিস্ময়কর ঘটনাটি বর্ণনা করেন। ইমাম ইবনে আবিদ্দুনিয়া (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মান আশা বা’দাল মাউত’-এ এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।

এই রোমহর্ষক ও শিক্ষণীয় ঘটনাটি থেকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের জন্য অনেক বড় বার্তা রয়েছে:

  • নেক আমলের শক্তি: দুনিয়াতে করা ছোট বা বড় নেক আমল—যেমন নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে হেঁটে যাওয়া কিংবা সবসময় মুখে আল্লাহর জিকির জারি রাখা—কঠিন মুসিবতের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ বা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
  • মৃত্যুর প্রস্তুতি: মৃত্যু যেকোনো সময় ঘনিয়ে আসতে পারে। তাই আযাবের ফেরেশতাদের ভয় থেকে রক্ষা পেতে এবং রহমতের ফেরেশতাদের সান্নিধ্য পেতে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত, জিকির ও সৎকর্মে অতিবাহিত করা উচিত।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি নেক আমল করার তৌফিক দান করুন এবং জীবনের শেষ মুহূর্তে আমাদেরকে ঈমান ও শান্তির মৃত্যু নসিব করুন। আমিন!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button