বদলি ফাইলবন্দি, খুঁটির জোর কোথায়? বরগুনায় এক যুগ ধরে ‘সিংহাসন’ গেড়েছেন এলজিইডি কর্মকর্তা

নূর হোসেন ইমাম ( অনলাইন এডমিন) ঃ সরকারি চাকরিতে তিন বছর পরপর বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক নিয়ম। কিন্তু বরগুনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) কর্মরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম যেন অকেজো। গত ১২ বছর ধরে তিনি একই চেয়ারে ‘অদৃশ্য ক্ষমতার’ জোরে আসীন রয়েছেন। এই এক যুগে তাকে ৬ বার বদলির আদেশ দেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে একটিও কার্যকর হয়নি। আর এই দীর্ঘ সময়ে বরগুনা ও ঢাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়।
এক যুগে ৬ বদলি: সবই সারশূন্য
প্রাপ্ত সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ৬ বার আনোয়ার হোসেনকে বিভিন্ন জেলায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়। নথিতে দেখা যায়:

- ২০১৪ ও ২০১৫ সালে যথাক্রমে পটুয়াখালী ও ভোলা।
- ২০১৮ ও ২০২০ সালে বরিশাল ও পটুয়াখালী সদরে।
- ২০২২ সালে ঝালকাঠি জেলা অফিসে।
- সর্বশেষ ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে তাকে বরগুনা জেলা অফিস থেকে বেতাগী উপজেলা অফিসে বদলি করা হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি আদেশে গন্তব্য দপ্তর নির্ধারণ থাকলেও তিনি কোনো এক জাদুকরী শক্তিতে বরগুনা জেলা অফিসেই থেকে গেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর খুঁটির জোর ঠিক কোথায় যে তিনি মন্ত্রণালয়ের আদেশকেও বারবার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন?
আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের পাহাড়
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বরগুনায় দীর্ঘ অবস্থানের সুযোগে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন এই কর্মকর্তা। তার সম্পদের একটি খতিয়ান নিচে দেওয়া হলো:

- জমি ও ভবন: বরগুনার লাকুরতলা পাড়ায় নিজের নামে ১০ শতাংশ জমি। এছাড়া ৩০ নম্বর বরগুনা মৌজায় মহিলা সংস্থা সংলগ্ন এলাকায় স্ত্রীর নামে আরও ১০ শতাংশ জমি এবং সেখানে একটি ৩ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন।
- ব্যবসা ও বাজার এলাকা: পরীর খাল বাজার সংলগ্ন এলাকায় স্ত্রীর নামে ৫ শতাংশ জমি ও সেখানে ২ তলা ভবন রয়েছে।

- ঢাকা কানেকশন: রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে তার। এছাড়া ওই একই এলাকায় আরও দুটি ভবনের মালিকানা নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে।
- বিলাসবহুল ‘রাজপ্রাসাদ’: বরগুনায় তার ব্যক্তিগত বাসভবনটি স্থানীয়ভাবে ‘রাজপ্রাসাদ’ নামে পরিচিত। অত্যাধুনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন, ৪টি এসি এবং দামি আসবাবপত্রে ঠাসা এই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচই তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি স্থানীয়দের।
সব মিলিয়ে বর্তমানে তার দৃশ্যমান স্থাবর সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকারও বেশি।

জনমনে প্রশ্ন ও প্রশাসনিক নীরবতা
একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর সীমিত বেতনে কীভাবে ঢাকা ও বরগুনায় এত সম্পদ গড়া সম্ভব, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কেন এই কর্মকর্তাকে কোনোভাবেই বদলি করা যাচ্ছে না? এই ‘অদৃশ্য ক্ষমতার’ উৎস কী?
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি এবং কর্ম ব্যাস্ততা দেখিয়ে বার বার ফোন কেটে দেন আনোয়ার হোসেন। অন্যদিকে, এলজিইডি, বরগুনা জেলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মেহেদী হাসান খানের পক্ষ থেকেও বদলি কার্যকর না হওয়ার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং এলজিইডি’র উচ্চপর্যায় এই ‘এক যুগের রাজত্ব’ এবং ‘কোটি টাকার সম্পদের’ বিষয়ে তদন্তে নামবে কি না—এখন সেটাই দেখার বিষয়।



