এম শাহীন আলম: বান্দরবানের বালাঘাটা এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রিত হর্টিকালচার সেন্টারে নতুন ভবন নির্মাণে ল্যাবরেটরি কাম অফিসের ৪তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ৪৬ লাখ ১৫ হাজার ৫৫৯ টাকা। যেখানে সরকার অতি প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দের অভাবে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে মাত্র ৪ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণের এতো ব্যয় বহুল বরাদ্দ দেওয়ার পরও নির্মাণ কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে খোদ প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর এর যোগসাজশে কাজ চলাকালীন সময়ে নিয়মিত তদারকিতে চরম দায়িত্বহীনতার কারণে সরেজমিনে না গিয়ে ঢাকায় বসে কাজের মনিটরিং করার কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পছন্দ মতো নিন্মমানের সামগ্রী ব্যবহার সহ অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমভি ও ইসি। এছাড়াও এই ভবন নির্মাণ কাজটির তদারকির দায়িত্বে যারা রয়েছেন,তারা কেউ সরেজমিনে কাজের তদারকি করতে আসছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তারা স্থানীয় এক লোকের মোবাইল ফোনের ভিডিও কলের মাধ্যমে ঢাকায় বসে কাজ তদারকি করছেন বলে নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা জানান। সরেজমিনে অনুসন্ধান আরো দেখা যায়, বাহির থেকে এতো বড় ভবন নির্মাণ চোখে না পড়ায় হর্টিকালচারের একেবারে ভেতরে নির্মাণ কাজটি হওয়ার কারণে কারো নজরে না আসায় অনেকটা লুকিয়ে খুব তড়িঘড়ি করে কাজের নিয়মিত ল্যাব টেষ্ট ছাড়াই স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজটির প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর সহ এই কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মনগড়া মতো ভবনটি নির্মাণ কাজে নিন্মমানের সামগ্রী ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা যায়, খুব তড়িঘড়ি করে পুরো ভবন নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে,বর্তমানে টাইলস বসানো,বিদ্যুৎ সংযোগ,ইন্টারনেট সংযোগ, সেনিটেশন, পাইপ ফিল্টারের কাজ সহ প্রায় সকল কাজে স্বল্প দামের কেনা নিন্মমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আগে ভবনটি নির্মাণ শুরুতে ফ্লোরে মাটি ভরাটের কাজে বালি দিয়ে ভরাটের কথা থাকলেও পাহাড়ের মাটি দিয়ে চলছে ফ্লোর ভরাটের অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় কয়েকজন লোক জানান, এই ভবনটি নির্মাণের প্রথম থেকেই ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী ভবনটির পিলারে ৬ সুতা ১৫ এমএম রড ব্যবহারের কথা থাকলেও প্রায় পিলারে ৫ সুতা বা ৪ সুতা রড দিয়ে কাজ করা হয়েছে। সরকারী ভবন নির্মাণ শর্ত মতে ভবনটি নির্মাণে ৪১ দিন লোড টেস্ট করার কথা থাকলেও নিয়ম মেনে তা করা হয়নি বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান আরো জানা যায়, কাজের প্রথম থেকেই সার্বিক অনিয়মের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে ভবন নির্মাণ কাজটি হয়েছে এবং কাজের শেষ পর্যায়ে এসেও গত ১৩/০৪/২০২৬ ইং তারিখে সরেজমিনে দেখা যায়, এখনো নিম্নমানের ইট-বালি খোয়া, পাথর ব্যবহার করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। নির্মাণ শ্রমিকদের ভাষ্য মতে জানা যায়, কন্ট্রাক্টর তাদের যে মালামাল এনে দিবে তাই দিয়ে তারা কাজ করতে বাধ্য। সরেজমিনে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কিংবা কাজ তদারকি কাজে নিয়োজিত কাউকে পাওয়া যায়নি।
এই ভবনটি নির্মাণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকৌশল বিভাগ না থাকায় একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মের অধীনে কাজটি সম্পাদন করছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের পরিচালক ঢাকায় থেকে ছন্দে আনন্দে তার ফেসবুক পেজে মনের সুখে গান করে আপলোড দিলেও নিয়মিত তিনি কাজের জায়গায় আসেন না। তাই কনস্ট্রাকশন ফার্মের লোকদের ম্যানেজ করে ইচ্ছেমত কাজ সম্পাদন করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এ প্রকল্পে তদারকির কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা যখন ঢাকা অফিস থেকে বান্দরবানে আসেন তখন তাদের আসা-যাওয়া থাকা-খাওয়াসহ সব কিছু ব্যবস্থা করেন এই কাজটির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা এবং কাজে ভালো মান রয়েছে এমন রিপোর্ট দেওয়ার জন্য পরিদর্শন টিমকে যাওয়ার সময় মোটা অংকের টাকা দেন বলে জানা যায়। তাই কাজ যেভাবেই হোক না কেন, সেটা নিয়ে মাথা ঘামান না কেউ। অফিস ঠিক থাকলে সব ঠিক। কনস্ট্রাকশন ফার্মকে ঠিকাদার যেভাবে বলেন, তারা সেভাবেই ভালো কাজ হয়েছে বলে রিপোর্ট দেন বলে জানা যায়।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় ঠিকাদার বলেন, চার তলা একটি ভবন যত অত্যাধুনিক-ই হোক না কেন, সাত থেকে আট কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়ার কথা না। আমরা বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বহুতল ভবন নির্মাণ করেছি, যার ব্যয় ধরা হয় চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা। কিন্তু এখানে হর্টিকালচারের চার তলা ভবন নির্মাণে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা ব্যয় এটা অতিরিক্ত। প্রকল্প পরিচালকরা অর্থ লুটপাট করার জন্য এমন আজগুবি ব্যয় ধরেছে। এটি নির্মাণে এত টাকা ব্যয় হওয়ার প্রশ্নই আসে না। ঠিকাদার আর প্রকল্প পরিচালক মিলে সব ভাগ-বাটোয়ারা করবে। দুদকের মাধ্যমে অনুসন্ধান করলে সত্যিটা বের হয়ে আসবে।
এদিকে কাজের বিষয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অনুসন্ধানকালে সরেজমিনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কেউ কিংবা সরকারি ভাবে কাজের তদারকির জন্য কোন প্রকৌশলী কাউকেও পাওয়া যায়নি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে আরো জানা যায়, প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর আওয়ামী রাজনীতির মতাদর্শী হওয়ার কারণে তিনি গত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে নিজের ঝুলিতে সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার নিকট হতে বেশ কয়েকটি পুরস্কার গ্রহণ করেন।
ভবন নির্মাণে অনিয়ম সহ সার্বিক বিষয়ে জানতে চেয়ে প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইরকে তার মুঠোফোনে কল দিলে তিনি জানান কিছু বলার থাকলে তার অফিসে গিয়ে সরাসরি দেখা করে কথা বলতে।
উল্লেখ্য, গত ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকল্পটির নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়। ২০২৬ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়াও প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর এর তত্ত্বাবধানে বিগত দিনে বান্দরবানের সহ আরো কয়েকটি জেলায় এমন ভবন নির্মাণ কাজে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে যা অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এই ভবন নির্মাণ কাজে অনিয়মের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক এবং আইনি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা পর্যন্ত ধারাবাহিক নিউজ চলমান থাকবে।



