চট্টগ্রাম

আনোয়ারায় রাজনৈতিক চক্রের দৌরাত্ম্যে ১৬ বছরেও খোলেনি দোকান

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী বাজারে জমির মালিক ও ডেভেলপারের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। প্রায় ১৬ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্পে দোকান বুঝে পেলেও ব্যবসা শুরু করতে না পারায় হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।

নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, জমির মালিক মোহাম্মদ ইব্রাহীম গংদের কাছ থেকে ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সূচনা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আবু তৈয়ব চৌধুরী ৩৯৬৫ নম্বর চুক্তিপত্র ও ৩৯৬৪ নম্বর অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তারনামা দলিলের মাধ্যমে মার্কেটটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

নির্মাণাধীন অবস্থাতেই ডেভেলপার বিভিন্ন দোকান, অফিস ও স্পেস বিক্রি করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় মালিকপক্ষ ও ডেভেলপারের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে প্রশাসন, থানা এবং আদালত পর্যন্ত গড়ায়। সালিশি রায়েও মেলেনি সমাধান। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি।

মালিকপক্ষ ২০১৯ সালে সালিশি মামলা দায়ের করলে তার ধারাবাহিকতায় সালিশি ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের ৩০ মে রায় দেয়। রায়ে সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র, আমমোক্তারনামা এবং বিভিন্ন বায়নানামা বাতিল করা হয়। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা (নং ২৮৫/২৪) দায়ের করেন ডেভেলপার ও ব্যবসায়ীরা। মামলায় সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায় স্থগিত করেছে আদালত। সুতরাং মার্কেটটির উদ্বোধনে কোনো বাধা নেই এমন দাবি ব্যবসায়ীদের। তারপরও জায়গার মালিকরা কাজে বাধা প্রদান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় দীর্ঘসূত্রতা কাটছে না।
২০২১ সালে ব্যবসায়ীদের চরম উৎকণ্ঠার মুখে তৎকালীন মন্ত্রীর নির্দেশে থানা প্রশাসন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে বৈঠক হয় এবং ডেভেলপারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে মার্কেটের কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ব্যবসায়ীরা নিজেদের অর্থ ব্যয়ে দোকানের কাজ প্রায় শেষ করেন। কিন্তু দোকান চালুর প্রাক্কালে আবারও নতুন করে বাধা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

হাইব্রিড প্রভাবশালী স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক চক্রের ছায়ায় সুবিধা ভোগের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ীরা জানান, জমির মালিকপক্ষ স্থানীয় কিছু সুবিধাবাদী হাইব্রিড রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবহার করে প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে দোকানগুলো চালু না হতে পারে সেজন্য অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, আমরা বৈধভাবে টাকা দিয়ে দোকান কিনেছি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে শুধু হয়রানির শিকার হচ্ছি। এখন ব্যবসা শুরু করতে গেলেও নানা অজুহাতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজ চক্রের মাধ্যমে এই বিরোধকে পুঁজি করে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা দ্বিগুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীরা এই জটিলতা নিরসনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করেছেন।

তাদের দাবি, দীর্ঘ ১৬ বছরের এই ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে দ্রুত দোকান চালুর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; অন্যথায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন জীবিকা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এ বিষয়ে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সভাপতি ইদ্রিস মাস্টার জানান, আমাদের জীবনের জমানো অর্থ দিয়ে দোকান কিনে বড় ঝামেলায় পড়ে গেছি। অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও জমিদারদের সহযোগিতা কামনা করছি।

এদিকে ডেভেলপার প্রোপ্রাইটর আবু তৈয়ব বলেন, ২০১০ সালে আনোয়ারায় প্রথম ডেভেলপার হিসেবে কাজ করে উন্নত পরিবেশ গড়ার মানসিকতা নিয়ে জায়গাটি নিয়েছিলাম। কিন্তু জায়গার মালিক কর্তৃপক্ষ আমাকে বারবার ঝামেলায় ফেলেছে। বিগত সরকারের আমলে আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে জেলে যাই। তখন জায়গার মালিকরা আমার বিরুদ্ধে সালিশি মামলা করে একতরফা একটি রায় নিয়ে আরও জটিলতা তৈরি করেছে। তিনি অবিলম্বে এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।

এ বিষয়ে জায়গার মালিক ইব্রাহিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সালিশি ট্রাইব্যুনালে আমরা রায় পেয়েছি। রায় স্থগিত হয়েছে জানালে তিনি তা জানেন না বলে জানান এবং তার ছেলে একজন আইনজীবী আছেন, তার সঙ্গে কথা বলে সংবাদ প্রকাশ করতে বলেন।

এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষে মামলা পরিচালনাধীন আইনজীবী কাসেম কামাল জানান, বর্তমানে দোকানের মালিকদের দোকান চালু করতে কোনো আইনগত জটিলতা নেই।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের মুখোশ উন্মোচন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব শিগগিরই প্রকাশিত হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button