অনুসন্ধানঅপরাধ

বাগধনিয়া ভূমি অফিসে দালালদের রামরাজত্ব

এম শাহীন আলম: ঢাকার সাভার উপজেলার পৌর এলাকার বাগধনিয়া ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, অনিয়ম এবং গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট অফিসের নায়েব এবং সহকারী কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতাতেই এই দালাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের নীরব সমর্থন ছাড়া এত প্রকাশ্যে অনিয়ম পরিচালনা সম্ভব নয়।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাগধনিয়া ভূমি অফিস অবস্থিত সাভার উপজেলা ভূমি অফিস থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে। সরকারি কাঠামো অনুযায়ী অফিসটিতে নায়েব, সহকারী নায়েব ও অফিস সহায়ক—মোট তিনজন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেখানে সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি দালালদেরও স্থায়ীভাবে বসে কাজ করতে দেখা গেছে।

অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, নায়েবের কক্ষের পাশেই চেয়ার-টেবিল বসিয়ে কয়েকজন দালালকে নিয়মিত কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অফিসের আরও দুটি কক্ষেও দালালদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসব কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অদৃশ্য ছত্রচ্ছায়াতেই পরিচালিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নায়েবের পাশের চেয়ার-টেবিলে বসা দালালরা নিজেদের ভূমি অফিসের “লোক” বা কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের সামনে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড রুমের নথিপত্র, বালাম বই এবং বিভিন্ন জমি সংক্রান্ত কাগজপত্র এনে দেওয়া হচ্ছে। পরে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে সেই নথির ছবি তুলে দেওয়া, ফটোকপি সরবরাহ কিংবা তথ্য বের করে দেওয়ার কাজ করা হচ্ছে প্রকাশ্যেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি গোপনীয় নথিপত্র এভাবে দালালদের হাতে তুলে দেওয়া শুধু অনিয়মই নয়, বরং এটি প্রশাসনিক নিরাপত্তা ও নাগরিক সেবার জন্যও মারাত্মক হুমকি।

ভুক্তভোগী একাধিক সেবাগ্রহীতার সাথে কথা বলে জানা যায়, এই অফিসে দালালদের সঙ্গে “রফা” ছাড়া কোনো কাজ সহজে সম্পন্ন হয় না। কেউ সরাসরি সরকারি নিয়মে আবেদন করলে বিভিন্ন অজুহাতে ভুল-ত্রুটি ধরা হয়, ফাইল আটকে রাখা হয় কিংবা দিনের পর দিন ঘোরানো হয়।
অন্যদিকে, দালালদের মাধ্যমে গেলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
একাধিক গ্রাহক অভিযোগ করেন, নামজারির আবেদন করার পর নায়েব সরেজমিন তদন্তে গেলে “অফিস খরচ” বা “তদন্ত খরচ” নামে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তদন্ত রিপোর্টে বিলম্ব করা, কাগজে ত্রুটি দেখানো কিংবা আবেদন ঝুলিয়ে রাখার মতো হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।
খাজনা পরিশোধের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, দালাল ছাড়া বাগধনিয়া ভূমি অফিসে সেবা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

দালালদের অফিসের ভেতরে বসিয়ে কাজ করার বিষয়ে সরাসরি নায়েবের কাছে জানতে চাইলে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পরে তিনি দাবি করেন, এসিল্যান্ড স্যারের সাথে পরামর্শ করেই লোকজন কাজ করছে।
নায়েবের এমন বক্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে কি উপজেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকেই এসব কার্যক্রম পরিচালনার নীরব অনুমোদন রয়েছে?

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সরাসরি সাভার উপজেলা ভূমি অফিস এ গিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি শুনানির ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে সাক্ষাৎ দিতে রাজি হননি। পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

বাগধনিয়া ভূমি অফিসে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, অনিয়ম এবং গ্রাহক হয়রানির বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই অনুসন্ধান চলবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button