জিলহজ মাসের মাহাত্ম্য ও ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক:হিজরি বর্ষপঞ্জির সর্বশেষ ও অন্যতম বরকতময় মাস হলো ‘জিলহজ’। এটি কেবল বছরের শেষ মাসই নয়, বরং ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম এই জিলহজ মাস ঘিরে হজ ও কোরবানির মতো দুটি মহান ইবাদত ও উৎসবের মিলনমেলা ঘটে। মুমিন হৃদয়ে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ জিলহজের প্রথম দশ দিনের ইবাদতকে মহানবী (সা.) বছরের শ্রেষ্ঠ আমল হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
পবিত্র কোরআনের আলোকে জিলহজ
সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে চারটি মাসকে ‘সম্মানিত’ ঘোষণা করেছেন, জিলহজ তার অন্যতম। এমনকি জাহেলি যুগের মুশরিকরাও এ মাসের সম্মান রক্ষার্থে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকত। সুরা ফাজরের শুরুতে আল্লাহ তাআলা এই মাসের প্রথম দশ রাতের শপথ করেছেন, যা এই সময়ের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতে, এই দশ দিন হলো কোরবানির মাসের সেই বিশেষ সময়, যার প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতের জন্য স্বর্ণালি সুযোগ।
হজ ও কোরবানি: ত্যাগের চূড়ান্ত পরীক্ষা
জিলহজ মাসের প্রধান দুটি ইবাদত হলো হজ ও কোরবানি। সামর্থ্যবানদের ওপর হজ ফরজ এবং নির্দিষ্ট সম্পদের মালিকদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। এই দুই ইবাদতের মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রমাণ দেয়। ত্যাগ ও তাকওয়ার এই মহান শিক্ষা মুমিন জীবনের পাথেয়।
ফজিলতপূর্ণ আমলসমূহ
কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই বরকতময় মাসের কিছু বিশেষ আমল নিচে তুলে ধরা হলো:
১. তাওবা ও ইস্তিগফার: জিলহজের প্রথম দশক দোয়া কবুলের অনন্য সময়। তাই পূর্ববর্তী পাপাচারের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা বা তাওবা করা মুমিনের প্রধান কর্তব্য।
২. নফল রোজা: জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে প্রথম নয় দিন রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) এই দিনগুলোতে রোজা রাখতেন। একটি রোজা এক বছরের রোজার সমতুল্য সওয়াব বয়ে আনে।
৩. তাকবির ও তালবিয়া: জিলহজ শুরু হওয়ার পর থেকে বেশি বেশি জিকির ও তাকবির পাঠ করা সুন্নাত। বিশেষ করে ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতি ওয়াক্ত সালাতের পর ‘তাকবিরে তাশরিক’ পাঠ করা প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের ওপর ওয়াজিব।
৪. তাহাজ্জুদ ও জিকির: এই দিনগুলোর রাতের ইবাদত বা তাহাজ্জুদ শবে কদরের ইবাদতের সমান মর্যাদা রাখে। সার্বক্ষণিক জিকিরের মাধ্যমে অন্তরকে সজীব রাখা ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকা এ সময়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
৫. কোরআন তেলাওয়াত ও দরুদ পাঠ: কোরআন তেলাওয়াতের প্রতিটি হরফে দশটি নেকি অর্জিত হয়। পাশাপাশি রাসুল (সা.)-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে বেশি বেশি দরুদ পাঠের মাধ্যমে ইমানের স্বাদ আস্বাদন করা সম্ভব।
৬. দোয়া ও দান-সদকা: হজ ও কোরবানির এই মৌসুমে দোয়া কবুলের হার অনেক বেশি। তাই নিজের ও উম্মাহর কল্যাণে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করা উচিত। একইসাথে সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকা করার মাধ্যমে গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানোও এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল।
পরিশেষে বলা যায়, জিলহজ মাস কেবল উৎসবের মাস নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও আমলনামা ভারী করার এক মহাসুযোগ। সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে আমল করার মাধ্যমে আমরা যেন এই বরকতময় সময়ের পূর্ণ ফায়দা হাসিল করতে পারি, আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।



