খেলাধুলা

ক্রিকেটার নাঈমকে হেনস্তার ঘটনায় খুলশী থানার এসআই শফিকুলসহ পুলিশ সদস্যরা বরখাস্ত

মুহাম্মদ জুবাইর: বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানকে চট্টগ্রামে পুলিশের মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি কেবল একজন জাতীয় ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা, মানবিক আচরণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্রীড়াঙ্গন, রাজনৈতিক অঙ্গন, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিক সমাজে বিষয়টি নিয়ে চলছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা। অনেকেই বলছেন, জাতীয় দলের পরিচিত একজন ক্রিকেটার যদি নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও পুলিশের হাতে মারধর ও অপমানের শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

জানা গেছে, শুক্রবার (১২ জুন) রাতে ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে বিমানযোগে চট্টগ্রামে ফেরেন জাতীয় দলের এই অফ-স্পিনার। রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে চান্দগাঁওয়ের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। শহীদ ওয়াসিম আকরাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে লালখানবাজার ফ্লাইওভার এলাকায় পৌঁছালে খুলশী থানার একটি টহল দল তার বহনকারী সিএনজি থামায়। প্রথমে চালকের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়। পরে নাঈমকে নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। নাঈমের দাবি, তিনি নিজ থেকেই পুলিশকে তার ব্যাগ পরীক্ষা করার অনুরোধ করেছিলেন এবং সহযোগিতামূলক আচরণ করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাঈম হাসান। তিনি বলেন, “আমি পুলিশকে বলেছিলাম, আমার ব্যাগ চেক করেন, প্রয়োজন হলে সবকিছু দেখেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একজন এসে আমার গলা চেপে ধরে বলে, তুই গাড়িতে উঠ। আমি জানতে চেয়েছিলাম কেন আমাকে এভাবে ধরা হচ্ছে। তখন তারা আরও উত্তেজিত হয়ে যায়।”

নাঈমের অভিযোগ, তাকে জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রতিবাদ করলে কয়েকজন মিলে তাকে মারধর শুরু করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে দুজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ সদস্য এবং একজন পাঞ্জাবি পরিহিত ব্যক্তি ছিলেন। ওই ব্যক্তি নিজের পরিচয় না দিলেও হাতে থাকা পাইপ দিয়ে তাকে আঘাত করেন। নাঈম বলেন, “আমি বারবার বলেছি আমি জাতীয় দলের ক্রিকেটার। আমার পরিচয়পত্র দেখিয়েছি। কিন্তু তারা আমার কোনো কথা শুনেনি। উল্টো বলেছে, তুমি আসামি, কথা বলবি না।”

ঘটনার সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে জানান নাঈম। তিনি বলেন, “একশ থেকে দেড়শ মানুষ আমাকে চিনতে পেরে পুলিশের কাছে বলেছে আমি জাতীয় দলের খেলোয়াড়। তারপরও তারা থামেনি। আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার অপরাধ কী।” তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ হলো, মারধরের একপর্যায়ে তাকে পুলিশের গাড়িতে না তুলে একটি সিএনজিতে তোলার চেষ্টা করা হয়। এ বিষয়ে নাঈম প্রশ্ন তুলে বলেন, “পুলিশের নিজস্ব গাড়ি তো সেখানে ছিল। তাহলে আমাকে কেন সিএনজিতে তোলা হচ্ছিল? কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল? কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল? আজও সেই প্রশ্নের উত্তর পাইনি।” তার এই বক্তব্য জনমনে আরও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

পরে তাকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু থানায় নেওয়ার পরও তার দুর্ভোগ শেষ হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। নাঈম বলেন, তাকে ওসির কক্ষে নেওয়া হলে সেখানেও অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়। তিনি বলেন, “আমি ওসিকে পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বলছিলাম। কিন্তু তিনি বারবার আমাকে বলছিলেন, চোখ নামিয়ে কথা বল। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তো কোনো অপরাধী নই। একজন নাগরিক হিসেবে আমার সঙ্গে এমন আচরণ কেন করা হবে?”

ঘটনার বিষয়ে নাঈমের বাবা, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক চান্দগাঁও ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহবুব আলমও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ছেলেকে থানায় নেওয়ার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত খুলশী থানায় যান। প্রথমে তাকে থানায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদ এবং নিজের পরিচয় দেওয়ার পর থানায় ঢোকার সুযোগ পান। মাহবুব আলমের দাবি, জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় পাওয়ার পরও তার ছেলেকে ন্যাক্কারজনকভাবে মারধর করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার ছেলে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হওয়ার কারণে আজ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু প্রতিদিন কত সাধারণ মানুষ এমন ঘটনার শিকার হন, তাদের খবর কেউ রাখে না।”
নাঈম আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে তার মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে ফোন ফিরে পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তামিম ইকবাল পরবর্তীতে খুলশী থানার ওসি এবং নাঈমের বাবা মাহবুব আলমের সঙ্গে কথা বলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই ফোনকলের পর থেকেই পুলিশের আচরণে পরিবর্তন আসে এবং পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

ঘটনার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে। বিসিবি জানায়, জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত। বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় বোর্ডের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (পিআর) আমিনুর রশিদ জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত এসআই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।

সিএমপির উত্তর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, চোরাচালান-সংক্রান্ত একটি তথ্যের ভিত্তিতে ওই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসঙ্গতি এবং প্রক্রিয়াগত ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নাঈম হাসানের ভাই কামরুল হাসান সাব্বির বাদী হয়ে মামলা দায়েরের উদ্যোগ নিয়েছেন। মামলায় খুলশী থানার এসআই (নিরস্ত্র) মো. শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি এখন আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।

ঘটনার পর মানবাধিকারকর্মী, ক্রীড়া সংগঠক, আইনজীবী এবং সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এটি কেবল একজন ক্রিকেটারের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রের নাগরিক নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়। তারা বলছেন, কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত কি না, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা বা অপমানজনক আচরণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সবশেষে নাঈম হাসানের সেই প্রশ্নটিই এখন জনমনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছেন, “আমার জায়গায় যদি একজন সাধারণ মানুষ থাকতেন, তাহলে হয়তো কেউ এগিয়ে আসত না, কেউ প্রশ্নও করত না। পুলিশের হাতেই যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?” জাতীয় দলের এই ক্রিকেটারের প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষেরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। বর্তমানে পুরো দেশের নজর তদন্তের ফলাফল এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button