অনুসন্ধানঅপরাধদুর্নীতি

অফিস সহকারী যেন আলাদিনের চেরাগ: ১৬তম গ্রেডের চাকরিতেই অর্ধশত কোটির সম্পদ!

এম এ মান্নান (কুমিল্লা): বেতন সীমিত, ব্যয় আকাশচুম্বী; ‘উপহার’ ও ‘সেলাইর’ আয়েই কোটিপতি শফিকুল দম্পতি! সরকারি চাকরির ১৬তম গ্রেডের একজন সাধারণ অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক। নিয়মানুযায়ী মাস শেষে নির্ধারিত বেতন আর সীমিত আয়ের বৃত্তেই বন্দি থাকার কথা ছিল তাঁর জীবনযাত্রা। কিন্তু নিয়তি নয়, যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন তিনি!

দীর্ঘ ৩৩ বছরের চাকরিজীবনের আড়ালে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়। সরকারি সামান্য বেতনের চাকরি করে কীভাবে তিনি ও তাঁর পরিবার এত বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হলেন, তা নিয়ে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তুমুল চাঞ্চল্য।​ অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে কর্মরত অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. শফিকুল ইসলামের দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী ও বিভিন্ন গোপন তথ্য পর্যালোচনায় তাঁর নিজের এবং পরিবারের নামে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

​তৃণমূল থেকে সম্পদের চূড়ায় তথ্য অনুযায়ী, শফিকুল ইসলাম ১৯৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। জাতীয় বেতন স্কেলের ১৬তম গ্রেডের এই পদে থেকে দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, কুমিল্লার বরুড়া এবং বর্তমানে মুরাদনগর উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। আর এই কর্মস্থল পরিবর্তনের সাথে সাথেই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাঁর সম্পদের পরিমাণ।

​আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয় শফিকুলের পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী তাছলিমা আক্তার, দুই মেয়ে ও এক ছেলে। স্ত্রী একজন গৃহিণী হলেও সন্তানদের পড়াশোনা দেশের নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বড় মেয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ছোট মেয়ে কুমিল্লার ইবনে তাইমিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে এবং ছেলে কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়াশোনা করছে। তিন সন্তানের পেছনে নূন্যতম মাসিক খরচ ৫০ হাজার টাকা এবং সংসারের অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে সর্বনিম্ন ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। একজন ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীর সীমিত বেতন দিয়ে কীভাবে এই বিলাসী ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে, তা নিয়েই উঠছে বড় প্রশ্ন।

​ব্যাংক ব্যালেন্স ও স্বর্ণের খনি গোপন সূত্রে পাওয়া সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, শফিকুলের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে জমা ও গচ্ছিত অর্থ রয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকারও বেশি। নগদ অর্থ রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া জিপিএফ/সিপিএফ খাতে জমা রয়েছে ৩০ লাখ টাকারও বেশি। নিজের নামে ৩ লাখ এবং স্ত্রীর নামে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকার আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর হিসাব দেখিয়েছেন তিনি।​সবচেয়ে বেশি চমক সৃষ্টি করেছে এই দম্পতির স্বর্ণালংকারের হিসাব। সম্পদ বিবরণীতে শফিকুল নিজের নামে ৫ ভরি এবং স্ত্রীর নামে ২২ ভরি—মোট ২৭ ভরি স্বর্ণের তথ্য দিয়েছেন। এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে ‘উপহার’, তবে চতুরতার সাথে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এর মূল্য। বর্তমান বাজারদরে যার মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

​জমি ক্রয়ের উৎস ‘স্ত্রীর ঋণ ও সেলাইর আয়’!
স্থাবর সম্পদের তালিকায় কুমিল্লার আদর্শ সদর ও দেবিদ্বার উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় কোটি কোটি টাকার কৃষি ও অকৃষি জমির মালিকানা রয়েছে তাঁর। ২০১৪ সালে আদর্শ সদর উপজেলার খেতাসার ও কৃষ্ণনগর মৌজায় ১৪ শতক কৃষি জমি ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায় ক্রয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিপুল অর্থের উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে অতীত সঞ্চয় ও ‘গৃহিণী’ স্ত্রীর কাছ থেকে নেওয়া ঋণ!
​এছাড়া ২০০৮ সালে কৃষ্ণনগর মৌজায় সাড়ে চার শতক জমি ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ক্রয় করা হয়েছে। আর এই অর্থের উৎস হিসেবে অতীত সঞ্চয়ের পাশাপাশি দেখানো হয়েছে ‘সেলাই কাজ’ এবং ‘প্রাইভেট টিউশনের’ আয়!

​একজন সরকারি সাধারণ কর্মচারী হয়েও এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় এবং তা আড়াল করতে ‘উপহার’ ও ‘সেলাই কাজের’ মতো খোঁড়া যুক্তি দেওয়ায় সাধারণ মহলে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। পর্দার আড়ালের এই বিপুল বিত্ত-বৈভবের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button