১৭ বছরের অভিযোগের বিচার কোথায়? আইজিপির হস্তক্ষেপ চাইলেন ভুক্তভোগীরা

মুহাম্মদ জুবাইর: রাউজানসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গুম-খুন, নির্যাতন, ভূমি দখল ও সন্ত্রাসের অভিযোগ; থানায় মামলা রেকর্ডে বাধার কথা উল্লেখ করে পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আবেদন
চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত বলে অভিযোগ ওঠা গুম, খুন, হামলা, নির্যাতন, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় মামলা গ্রহণ ও নথিভুক্ত করার দাবিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। আবেদনে দাবি করা হয়েছে, বহু ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত রয়েছেন এবং অসংখ্য অভিযোগ এখনো থানার সাধারণ ডায়েরি বা মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি।
আবেদনকারীরা অভিযোগ করেছেন, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দীর্ঘ সময় ধরে সংঘটিত নানা অপরাধের ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোচিত হলেও সেগুলোর অনেকগুলো কখনোই আইনগত প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে বহু পরিবার বছরের পর বছর বিচারহীনতার বোঝা বহন করছে।
আবেদনের একটি বড় অংশজুড়ে রাউজান উপজেলার পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ভীতি ও আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। আবেদনে দাবি করা হয়, ওই সময়ে অনেক ব্যক্তি ও পরিবার নানা ধরনের নির্যাতন, হামলা এবং হয়রানির শিকার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা থানায় মামলা করতে পারেননি।
আবেদনকারীদের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক প্রভাব, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রতিশোধের আশঙ্কায় বহু ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে আসতে সাহস পাননি। ফলে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের অভিযোগগুলো স্থানীয়ভাবে আলোচিত হলেও সেগুলোর একটি বড় অংশ আইনি নথিতে স্থান পায়নি।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই-২০২৪ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজন মনে করেছিলেন, অতীতের ঘটনাগুলো এবার তদন্তের আওতায় আসবে এবং তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে বহু অভিযোগ এখনো মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করেও তারা কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো রাজনৈতিক সহিংসতা বা ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগকে মামলা হিসেবে গ্রহণে অনীহার মুখে পড়তে হয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে বলা হয়েছে, অতীতের গুরুতর অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলে আবেদনকারীদের দাবি।
তাদের মতে, কোনো সমাজে যদি গুরুতর অপরাধের বিচার না হয়, তবে ভবিষ্যতে নতুন অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই অতীতের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা জরুরি।
আবেদনে রাউজানের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বিগত কয়েক মাসে এলাকায় খুন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অস্ত্রের মহড়া, চাঁদাবাজি, গোলাগুলি ও লুটপাটের মতো ঘটনা বেড়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনকারীরা মনে করেন, অতীতের অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়া এবং অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের অভাব বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত হতে পারে।
লিখিত আবেদনে আইজিপির কাছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে ভুক্তভোগীরা তাদের অভিযোগ থানায় দাখিল করতে পারেন এবং আইন অনুযায়ী সেগুলো যথাযথভাবে রেকর্ড করা হয়।
এছাড়া, অতীতে সংঘটিত বলে অভিযোগ ওঠা গুরুতর অপরাধগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। আবেদনকারীরা বলছেন, তারা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা চান না; বরং আইনের শাসনের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে চান।
এই আবেদনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের একটি অংশের মতে, যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তারা বলছেন, অভিযোগকারীদের কথা শোনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযুক্তদের আইনগত অধিকারও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব।
এদিকে আবেদনকারীরা আশা প্রকাশ করেছেন, পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার পথ সুগম করবে। তাদের ভাষায়, “বিচারহীনতার অবসান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন চট্টগ্রামের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।”



