অর্থনীতি

বিরোধিতার মধ্যেই এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি কাল

নিজস্ব প্রতিবেদক: ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হবে ঢাকায় প্রকল্প ব্যয় ২০৫ মিলিয়ন ডলার ২০২৫ সালে বন্দরের ৪৪ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং এনসিটিতে শ্রমিক-কর্মচারী ও বিভিন্ন সংগঠনের বিরোধিতা

বন্দর রক্ষা কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরোধিতার মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের (ডিপি ওয়ার্ল্ড) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগোচ্ছে। আগামীকাল বিকেল ৩টায় ঢাকাস্থ ইনভেস্ট বাংলাদেশ-এর অডিটোরিয়ামে এনসিটি ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় এ চুক্তি হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ হবে ১৫ বছর। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পিপিপি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চুক্তি স্বাক্ষরকে প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মনোনীত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি উন্নয়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কনসেশন দেওয়ার লক্ষ্যে এ চুক্তি করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যে চুক্তি হতে যাচ্ছে, সেটি দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি। গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫ বছরের খসড়া কনসেশন চুক্তির অনুমোদন দেয়।তবে ওই সময় বিদেশি অপারেটর হিসেবে কোন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা ও সরকারি নথির মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম সামনে আসে।

চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এনসিটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি বন্দর অপারেটরকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে।এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আলোচনা বেশ কিছুদিন ধরে চলছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।পরবর্তী সময়ে বিষয়টি এগিয়ে নিতে গত জুন মাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনাকারী কমিটিকে সহায়তার জন্য ১২ সদস্যের একটি বিশেষ সহায়ক দল গঠন করে। ওই দলের মাধ্যমে চুক্তির বিভিন্ন শর্ত, পরিচালন কাঠামো, বিনিয়োগ, কারিগরি বিষয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়।

আলোচনার ধারাবাহিকতায় খসড়া কনসেশন চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে আসে এবং গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর এখন চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় এনসিটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।ফলে এনসিটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কোনো বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া হলে তা চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক পরিচালন কাঠামো এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের যুক্তি হচ্ছে, আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ কোনো টার্মিনাল অপারেটর যুক্ত হলে বন্দরের পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত কনটেইনার হ্যান্ডলিং, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানের বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটির সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানো এবং পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় গতি আসতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানও আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুততর পণ্য হ্যান্ডলিং, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। সরকার মনে করছে, আন্তর্জাতিক অপারেটরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটির কার্যক্রমকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করা গেলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।

তবে এনসিটি ও ওসিওয়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে চট্টগ্রামে শুরু থেকেই বিরোধিতা রয়েছে। বন্দর রক্ষা কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে।তাদের অভিযোগ, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বন্দর অবকাঠামোর পরিচালন দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বন্দরের ওপর দেশীয় নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তারা চুক্তির শর্ত, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে এনসিটি ও ওসিওয়াই ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে দেওয়ার চুক্তির খসড়া বাতিলের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়।

ওই কর্মসূচি থেকে সংশ্লিষ্টরা আগামী ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেন। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ও পরে এনসিটি ইস্যুতে চট্টগ্রামে আন্দোলন আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে গেলে সেখানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি, কর্মপরিবেশ ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হবে-এ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বন্দর-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন এ বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দাবি করছে।

তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থ এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা যেন উপেক্ষিত না হয়। একই সঙ্গে চুক্তির আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্তগুলো জনসমক্ষে পরিষ্কার করার দাবিও উঠেছে। এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনার প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ কাঠামোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে সরকারি অবকাঠামো ও সম্পদ ব্যবহারে বেসরকারি খাতের দক্ষতা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগানো। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ২০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মনোনীত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কনসেশন দেওয়ার মাধ্যমে এনসিটি উন্নয়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে যাবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্মিনাল আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার পথ কার্যত উন্মুক্ত হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনালগুলোতে আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে (আরএসজিটি)।পাশাপাশি চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার জন্যও আরএসজিটিকে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

ফলে এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হবে। এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সরকারের দীর্ঘদিনের একটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে যাবে। তবে একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে চট্টগ্রামে যে বিরোধিতা তৈরি হয়েছে, সেটিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।একদিকে সরকারের লক্ষ্য বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো, অন্যদিকে বন্দর রক্ষা কমিটি, শ্রমিক-কর্মচারী ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতীয় স্বার্থ, স্বচ্ছতা, চুক্তির শর্ত এবং কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।ফলে আগামীকাল চুক্তি স্বাক্ষরের পর এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের ভূমিকা, বিনিয়োগের ধরন, পরিচালন কাঠামো, রাজস্ব ও মুনাফা বণ্টন, শ্রমিক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ এবং বন্দরের সামগ্রিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকছে-এসব বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসবে।চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলোতে আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করার সরকারি উদ্যোগ নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করবে। একই সঙ্গে এনসিটি নিয়ে চলমান বিরোধিতা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিও আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button