অনুসন্ধানঅপরাধ

কুমিল্লা সদর উপজেলায় উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহাগের বিরুদ্ধে ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ সহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

এম শাহীন আলম: কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন সোহাগের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জন্মনিবন্ধন অনুমোদন ও সংশোধনকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেন, টিসিবির আবেদন তদন্তে অর্থ আদায়, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, সরকারি অর্থ বণ্টনে কমিশন দাবি এবং অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া কুমিল্লা টাউন হল এলাকায় অবস্থিত কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাবে জুয়ার আসর পরিচালনা ও তাতে নিয়মিত অংশগ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রাম পুলিশদের প্রশিক্ষণ বাবদ বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং বিতরণ করা অর্থের হিসাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের জন্য ছয়টি ইউনিয়ন থেকে মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হলেও ৪৩ জন গ্রাম পুলিশকে জনপ্রতি ১ হাজার ৪০০ টাকা করে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সে হিসাবে বিতরণ করা অর্থের পরিমাণ ৬০ হাজার ২০০ টাকা। অবশিষ্ট ৪ লাখ ১৯ হাজার ৮০০ টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ ছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তর করের এক শতাংশ খাত থেকে ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ কোটি টাকা বণ্টনের প্রক্রিয়ায় চার শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগও সামনে এসেছে। অন্যদিকে, প্রায় ১৬০টি টিসিবির আবেদন তদন্তের সময় আবেদনকারীদের কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

চাকরিতে যোগদান ও বদলি নিয়ে প্রশ্ন: অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মো. আমির হোসেন সোহাগ ২০১২ সালে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনে চাকরিতে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে কুমিল্লার ঠিকানা ব্যবহার করে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনে বদলি হয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাঁর ব্যবহৃত ঠিকানাটি যথাযথ ছিল কি না, বদলির আবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরকারি রেকর্ডের কোনো অসংগতি ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

সোহাগের অফিসে উপস্থিতি ও কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ: উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহাগের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সঙ্গে প্রায়ই অশোভন আচরণের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর আচরণের কারণে অধস্তন কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত দাপ্তরিক সময়ে অফিসে উপস্থিত না থাকার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, তিনি সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাবে অবস্থান করেন এবং পরদিন দুপুরের দিকে অফিসে আসেন।

কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাবে জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ: মো. আমির হোসেন সোহাগের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, কুমিল্লা টাউন হল এলাকায় অবস্থিত কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাবে মাহবুব নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে জুয়ার আসর পরিচালিত হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই আসর থেকে সোহাগ প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার টাকা করে পান। পাশাপাশি প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি নিজেও সেখানে জুয়া খেলায় অংশ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্লাবের ভেতরে তাঁর জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটি কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

টিসিবির আবেদন তদন্তে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সোহাগের বিরুদ্ধে: টিসিবির পণ্যপ্রাপ্তির আবেদন যাচাই ও তদন্তের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহাগের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৬০টি টিসিবির আবেদন তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আসে। এসব আবেদন যাচাইয়ের সময় প্রত্যেক আবেদনকারীর কাছ থেকে অফিস খরচের নামে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

উপজেলায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগে অনিয়মে সোহাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ: কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মী রানী হরিজনের মেয়ে রাশিকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে উপজেলা পরিষদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এ নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি, পরীক্ষা নেওয়া হয়নি এবং উপজেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট সদস্য ও কর্মকর্তাদের অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

অভিযোগকারীদের দাবি, উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহাগের তদবিরে নিয়োগটি সম্পন্ন হয় এবং নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার টাকা।

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে আগে থেকেই দুজন অফিস সহায়ক, একজন মালি ও একজন আনসার সদস্য কর্মরত রয়েছেন। এ অবস্থায় নতুন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা, অনুমোদিত জনবল কাঠামো এবং বেতন-ভাতার অর্থের উৎস পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সম্পত্তি হস্তান্তর করের অর্থ বণ্টনে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সোহাগের বিরুদ্ধে: সম্পত্তি হস্তান্তর করের এক শতাংশ খাত থেকে ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ কোটি টাকা বণ্টনের প্রক্রিয়ায় চার শতাংশ কমিশন বা ঘুষ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন সোহাগের বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ বণ্টনের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও অন্যদের কাছে কমিশন দাবি করা হয়। এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হওয়ায় অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

গ্রাম পুলিশদের প্রশিক্ষণের অর্থের হিসাব নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সোহাগের বিরুদ্ধে: গত ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গ্রাম পুলিশদের কর্মদক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রশিক্ষণের অর্থ সংগ্রহ ও বিতরণ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন সোহাগ ছয়টি ইউনিয়ন থেকে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য ৮০ হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন।

অন্যদিকে, অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি ইউনিয়নের মোট ৪৩ জন গ্রাম পুলিশকে প্রশিক্ষণ ভাতা ও যাতায়াত ভাতা বাবদ জনপ্রতি ১ হাজার ৪০০ টাকা করে দেওয়া হয়।

হিসাবটি হলো:

  • ছয়টি ইউনিয়ন থেকে সংগৃহীত অর্থ: ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
  • প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া গ্রাম পুলিশ: ৪৩ জন।
  • জনপ্রতি প্রদত্ত অর্থ: ১ হাজার ৪০০ টাকা।
  • মোট বিতরণ করা অর্থ: ৬০ হাজার ২০০ টাকা।
  • সংগৃহীত ও বিতরণ করা অর্থের পার্থক্য: ৪ লাখ ১৯ হাজার ৮০০ টাকা।

জন্মনিবন্ধন অনুমোদন ও সংশোধনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সোহাগের বিরুদ্ধে: জন্মনিবন্ধন অনুমোদন এবং বয়স সংশোধনের কাজকে কেন্দ্র করেও উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহাগের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত কাজে প্রতিদিন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, হিসাব সহকারী ও উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এসব লেনদেন পরিচালিত হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমির হোসেন সোহাগের বিরুদ্ধে  অভিযোগ তদন্তে যেসব নথি ও বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন

১. মো. আমির হোসেন সোহাগের চাকরিতে যোগদান, ব্যক্তিগত নথি, ঠিকানাসংক্রান্ত তথ্য ও বদলির সরকারি আদেশ।

২. কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাবে জুয়ার আসর পরিচালনা, অর্থ লেনদেন এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ।

৩. টিসিবির প্রায় ১৬০টি আবেদন তদন্তের সময় আবেদনকারীদের কাছ থেকে কোনো অননুমোদিত অর্থ নেওয়া হয়েছিল কি না এবং তদন্ত প্রতিবেদন কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল।

৪. ২০২৬ সালের আগস্টে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের বৈধতা, নিয়োগবিধি, অনুমোদন, নিয়োগ আদেশ এবং বেতন-ভাতার অর্থের উৎস।

৫. সম্পত্তি হস্তান্তর করের এক শতাংশ খাত থেকে ছয়টি ইউনিয়নে অর্থ বণ্টনের অনুমোদন, বরাদ্দ ও ছাড়ের নথি এবং চার শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না।

৬. গ্রাম পুলিশদের প্রশিক্ষণের জন্য সংগৃহীত ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ব্যয়ের ভাউচার, অর্থ বিতরণের তালিকা এবং অবশিষ্ট অর্থের অবস্থান।

৭. জন্মনিবন্ধন অনুমোদন ও বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে অনিয়ম, সরকারি ফির অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ।

৮. অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং দাপ্তরিক সময়ে উপস্থিতি-সংক্রান্ত অভিযোগ যাচাইয়ে হাজিরা রেজিস্টার, দায়িত্ব বণ্টনের নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য।

৯. অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন সোহাগের লিখিত বক্তব্য এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা।

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগে অনিয়ম এবং সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের মতো অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে গ্রাম পুলিশদের প্রশিক্ষণের অর্থের হিসাব, টিসিবির আবেদন তদন্তে কথিত অর্থ আদায়, জন্মনিবন্ধন অনুমোদনকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর করের অর্থ বণ্টনে কমিশন দাবির বিষয়গুলো নথিনির্ভর তদন্তের দাবি রাখে।

আমীর হোসেন সোহাগ এর অনিয়মের বিষয়ে কুমিল্লা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব তালুকদার জানান, আপনি যে অভিযোগ গুলো উপস্থাপন করেছেন এই অভিযোগ গুলো আমি এই উপজেলা অফিসটিতে যোগদান করার আগের বিষয়। তিনি জানান আমি আসার আগে কি হয়েছে তা তো জানি না। তবে যোগদান করার পর সচ্ছলতার সহিত সকল কার্যক্রম পরিচালনা করার চেষ্টা করছি।

অভিযোগে বিষয়ে আমীর হোসেন সোহাগকে তার বক্তব্য জন্য হোয়াটসঅ্যাপে নক দিলেও তিনি কোন রিপ্লাই দেননি।

কুমিল্লা সদর উপজেলায় অনিয়মের সাথে জড়িত আমীর হোসেন সোহাগ এবং মোর্শেদ এর বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। তাদের অনিয়ম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে নিউজ চলমান থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button