দেশ

দুই দিনের বিচ কার্নিভাল উৎসবে মাতল কুয়াকাটা,আলোচনায় সাফল্য-ব্যর্থতা

নিজস্ব প্রতিবেদক (কুয়াকাটা,পটুয়াখালী): দীর্ঘ নয় বছর পর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল-২০২৬ ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম,খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে দুই দিনব্যাপী এই উৎসব।তবে পর্যটনকে নতুনভাবে তুলে ধরার এই উদ্যোগে সম্ভাবনার পাশাপাশি উঠে এসেছে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, বিচ ম্যারাথন নিয়ে অসন্তোষ,তথ্যসেবার ঘাটতি,অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ এবং সৈকতের পরিবেশদূষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আয়োজন ঘিরে একদিকে যেমন কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে, অন্যদিকে পর্যটকদের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা এবং বড় আয়োজনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। ফলে কার্নিভালটির মূল্যায়নে শুধু মানুষের উপস্থিতি কিংবা বিনোদনমূলক আয়োজন নয়,পর্যটকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘমেয়াদি সুফলকেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।

পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি,উৎসবের প্রাণবন্ত পরিবেশ বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই কার্নিভাল ২৩ অক্টোবর সকালে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্টসংলগ্ন এলাকায় বিচ ফুটবল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে শুরু হয়।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামীমুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কার্নিভাল উপলক্ষে কুয়াকাটায় কয়েক হাজার পর্যটক ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে বলে জানানো হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে সৈকত ও আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য বাড়ে। আবাসিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে কক্ষের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং কিছু ক্ষেত্রে কক্ষসংকটের খবরও প্রকাশিত হয়।

কার্নিভালকে ঘিরে পর্যটকদের এই আগমন কুয়াকাটার জনপ্রিয়তা এবং দেশীয় পর্যটন বাজারে এর সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছে।তবে বিপুল জনসমাগমকে দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন উন্নয়নে রূপ দিতে হলে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা,মানসম্মত সেবা ও পর্যটকদের আস্থার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

দুই দিনব্যাপী কার্নিভালে বিচ ফুটবল,বিস ম্যারাথন, ঘুড়ি উৎসব,চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পুঁথিপাঠ,বাউলগানের আসর,ফ্যাশন শো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিচ ক্রিকেটসহ বিভিন্ন কর্মসূচি রাখা হয়। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের দর্শনীয় স্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন আয়োজনও ছিল।

স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উৎসবের প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। দেশের পরিচিত শিল্পীদের পরিবেশনাও দর্শকদের আগ্রহ বাড়ায়।

এই আয়োজনের ইতিবাচক দিক হলো, কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি ও শিল্পীদের তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতিকে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে কুয়াকাটাকে আরও স্বতন্ত্র পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে।

তবে বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রচারিত কর্মসূচি, অতিথিদের উপস্থিতি এবং বাস্তবে অনুষ্ঠিত কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।এ ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ তথ্যপ্রচার ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি পর্যটকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে পারে।

কার্নিভালের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিচ ম্যারাথন।সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশে দৌড় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ক্রীড়া ও পর্যটনকে একত্র করার উদ্যোগটি সম্ভাবনাময় হলেও এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন অংশগ্রহণকারী।

নিবন্ধন-সংক্রান্ত সহযোগিতা,প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তি এবং অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রত্যাশিত সেবা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।তাঁদের কারও কারও দাবি, আয়োজনের আগে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তব অভিজ্ঞতা তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

এ ধরনের প্রতিযোগিতায় নিবন্ধন নিশ্চিতকরণ, অংশগ্রহণকারীদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা,নির্ধারিত সময়সূচি,পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক,চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তা এবং পুরস্কার বা অংশগ্রহণ-সংশ্লিষ্ট উপকরণ বিতরণে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ আয়োজনে সংশোধন আনা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে আয়োজক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

তথ্যকেন্দ্রের সেবা না পাওয়া এবং বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে।পর্যটকদের অভিযোগ অনুযায়ী, কোথায় কোন অনুষ্ঠান হবে,কখন শুরু হবে এবং কীভাবে বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়া যাবে—এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য তথ্যের অভাব ছিল।

বড় উৎসবে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী উপস্থিত হলে তথ্যকেন্দ্র,দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড,ঘোষণাব্যবস্থা, হালনাগাদ সময়সূচি এবং অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।এসব সেবা দুর্বল হলে পর্যটকদের সময় নষ্ট হয়,বিভ্রান্তি বাড়ে এবং আয়োজনের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অনুষ্ঠানস্থলে ধারণক্ষমতা ও দর্শকদের বসার জায়গা নিয়েও অসন্তোষের কথা প্রকাশ পেয়েছে।ভবিষ্যতে দর্শনার্থীর সম্ভাব্য সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে মঞ্চ, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, বসার স্থান এবং জরুরি চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কার্নিভাল উপলক্ষে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে আবাসন ও স্থানীয় পরিবহনের চাহিদা বেড়ে যায়।এ সুযোগে কিছু হোটেল,রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় যানবাহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে এসেছে।

পর্যটকদের কাছ থেকে হোটেলভাড়া বৃদ্ধির অভিযোগ পাওয়া গেছে। আগে যে রুমের ভাড়া ১৫০০টাকা থেকে ২০০০টাকা ছিলো বর্তমানে ৩০০০হাজার থেকে ৪০০০হাজার টাকা এছাড়া অটোরিকশা, টমটম ও অটোভ্যানে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফের বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।পর্যটকদের আস্থা ধরে রাখতে আবাসন ও পরিবহন খাতে স্বচ্ছ ভাড়াব্যবস্থা,অভিযোগ জানানোর সহজ পদ্ধতি এবং কার্যকর তদারকি জরুরি।

বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদনে ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌপুলিশ,নিয়মিত পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ৭০০ সদস্য মোতায়েনের তথ্য জানানো হয়েছে।

এটি বড় জনসমাগম সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। তবে পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়;পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা,নিরাপদ চলাচল,জরুরি চিকিৎসা এবং পরিবেশ সংরক্ষণও এর অংশ।

কার্নিভাল ঘিরে সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা ও সমুদ্রদূষণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশের খবরও এসেছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ করা না গেলে সৈকতের সৌন্দর্য ও সামুদ্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

২৫ অক্টোবর সকালে সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুধু উৎসবের পরপর পরিচালনা করলেই যথেষ্ট নয়।অনুষ্ঠান চলাকালে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন,বর্জ্য সংগ্রহকারী দল,প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা দরকার।

কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন,জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ের কারণে বড় আয়োজনটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

অন্যদিকে, অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসা সমালোচনা ইঙ্গিত দেয়,ভবিষ্যৎ আয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।

কার্নিভালকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন বাড়লে হোটেল,রেস্তোরাঁ, পরিবহন,স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অংশগ্রহণও তাঁদের কাজ পরিচিত করার সুযোগ করে দেয়।

তবে দুই দিনের উৎসবের সাফল্য দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা পড়েছে,তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ জন্য পর্যটকের প্রকৃত সংখ্যা,হোটেল বুকিং, ব্যবসায়িক লেনদেন, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং পর্যটকদের সন্তুষ্টি নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ,ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য স্টল বরাদ্দ,স্থানীয় সংস্কৃতির প্রচার এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনের সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button