পাহাড়তলীর গার্মেন্টসে বেতন নিয়ে চরম অনিয়মের অভিযোগ, ২০ হাজার টাকা পেতে শ্রমিকের অপেক্ষা ২০ মাস

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানা এলাকার সিডিএ মার্কেট, অলংকারসহ আশপাশের বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও বকেয়া পাওনা পরিশোধ নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মাস শেষে নিয়মিত বেতন না দিয়ে ৫০০, ১ হাজার কিংবা ২ হাজার টাকা করে কিস্তিতে পরিশোধ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। নিজের কষ্টার্জিত বেতন তুলতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টোকেন সংগ্রহ করেও মিলছে না পাওনা টাকা। কোনো কোনো শ্রমিককে বকেয়া ২০ হাজার টাকা পেতে এক বছর আট মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, মাসের পর মাস তাঁদের বেতন আটকে রাখা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে সম্পূর্ণ বেতন পরিশোধ না করে সামান্য কিছু টাকা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংসারের খরচ, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার।
একজন শ্রমিকের অভিযোগ, তাঁর পাওনা ২০ হাজার টাকা আদায় করতে প্রায় এক বছর আট মাস সময় লাগছে। অর্থাৎ নিজের শ্রম, ঘাম ও সময়ের বিনিময়ে অর্জিত টাকা পেতেও তাঁকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা এভাবে বছরের পর বছর আটকে রাখার অধিকার কারও আছে কি না।
শুধু কর্মরত শ্রমিকরাই নন, চাকরি ছেড়ে দেওয়া অনেক শ্রমিকও তাঁদের বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা বুঝে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। পাওনা টাকা চাইতে গেলে নানা ধরনের হয়রানি, ভীতিকর পরিস্থিতি এবং অসদাচরণের শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শ্রমিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, বেতন ও বকেয়া পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেই। শ্রমিকদের কখন টাকা দেওয়া হবে, কত টাকা দেওয়া হবে কিংবা সম্পূর্ণ পাওনা কবে পরিশোধ করা হবে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব গার্মেন্টস কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের প্রভাব এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। বর্তমানেও রাজনৈতিক বলয়ের কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করে শ্রমিকদের অসন্তোষ ও দাবি-দাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি শ্রমিকদের পাওনা আদায়ের দাবি এবং অনিয়মের প্রতিবাদ দমাতে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। কারখানার মালিকপক্ষ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি।এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে-শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আটকে রেখে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হওয়ার পেছনে কারও পরিকল্পিত ভূমিকা রয়েছে কি না? কোনো মহল কি শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে বর্তমান বিএনপি সরকারকে বিব্রত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করছে? যদি এমন কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ বা পরিকল্পনা থেকে থাকে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা উচিত। তবে কোনো প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের অভিযোগকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আমরা কোনো শ্রমিক অসন্তোষ চাই না, শিল্পকারখানায় অস্থিতিশীলতা চাই না, চাই না কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দীর্ঘদিন আটকে রেখে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার প্রত্যাশা করাও বাস্তবসম্মত নয়।একজন শ্রমিক সারাদিন কারখানায় পরিশ্রম করেন পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য। অথচ মাস শেষে নিজের বেতন না পেয়ে তাঁকে যদি দিনের পর দিন অন্যের কাছে ধারদেনা করতে হয়, তাহলে তাঁর পরিবার কীভাবে চলবে? একজন শ্রমিকের ২০ হাজার টাকা পেতে যদি ২০ মাস অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সেই সময় তাঁর সংসারের দায়িত্ব কে নেবে?
শ্রমিকের বেতন কোনো অনুদান নয়, এটি তাঁর শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আইনগত অধিকার। মালিকপক্ষের আর্থিক সংকট কিংবা ব্যবসায়িক সমস্যার অজুহাতে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষায় রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়।পাহাড়তলী থানা এলাকার শ্রমিকদের উত্থাপিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি দাবি জানানো হচ্ছে।



